মহানগর সময় পর্দার ঘেরাটোপ পেরিয়ে যেভাবে অমর সুফিয়া কামাল

০১-০৩-২০২১, ২১:৫৯

প্রান্তী ছরোয়ার

fb tw
পর্দার ঘেরাটোপ পেরিয়ে যেভাবে অমর সুফিয়া কামাল
04
নারী তুমি অন্ধের দৃষ্টি, বোবার ভাষা, বোধির শোনার অভিলাষ, প্রাণের আকুতি, মনের মিনতী, সৃষ্টির মহা ইতিহাস। মায়া, মমতা আর দৃঢ় নেতৃত্বে নারী সত্যিই এক মহা ইতিহাস। নারী দিয়েই সৃষ্টির সূচনা এ বিশ্ব সংসার। নারীহীনা জগৎ সংসারে নর যে বড় অসহায়। জননী হয়ে গড়ে জীবন, রমনী হয়ে সাঁজায়।
অনেকেই নারী কি পাচ্ছেন সেদিকটাই আলো ফেলে দেখেন বা দেখানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু কতটা হারিয়ে একজন নারীর মনে ক্ষোভের চোরা গলিতে ছেয়ে যায় অন্ধকার। সেখানে আলো ফেলে অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করেন না। বেমালুম ভুলে যান সভ্যতার প্রথম থেকেই কিন্তু নারীর নেতৃত্বেই চলতো সবকিছু। শক্তি সামর্থ্য বেশি থাকায় আদিম সময়ে পুরুষেরা বাইরের দিকটা সামলাতো। কিন্ত সভ্যতা এবং উন্নয়নের সাথে সাথে সেটি চলে গেছে পুরুষের নেতৃত্বে। আর সেই প্রভাব খাটিয়ে কখনও কখনও কিছু পুরুষ কিছু সমাজতন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ করতে চায় নারীকে।
সমাজের সর্বস্তরে নারীর সাফল্য ও জয়গান গাওয়ার দিন হিসেবে একটা দিন পালন করা হয় নারী দিবস হিসেবে। আসলে নারী সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করতেই নারী দিবসের উদ্দেশ্য। যদিও নারীর প্রতি সম্মান একদিনের বিষয় নয়, তবুও একটা দিনই বা কম কিসে?
নারী দিবস উপলক্ষে জানবেন প্রগতিশীল চিন্তার মহীয়সী এক নারীর জীবনের চড়াই উতরায় পার করে অমর হওয়ার গল্প। একজন প্রথিতযশা কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব বেগম সুফিয়া কামালের কথা। কীভাবে তিনি আজকের সুফিয়া কামাল?
মহীয়সী নারী কবি সুফিয়া কামালের জীবন ছিল অনেক ঘটনাবহুল। যখন মাত্র সাত বছর বয়স, তখন তার বাবা গৃহত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হন। তারপর তিনি মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের সঙ্গে নানা বাড়িতে বড় হন। রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। সুফিয়া কামাল তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। তখনকার পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবেশে বাস করেও তিনি নিজ চেষ্টায় হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত। বাড়িতে উর্দুর চলন থাকলেও নিজেই বাংলা ভাষা শিখে নেন। পর্দার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একজন আধুনিক মানুষ।
১৯২৩ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে সুফিয়ার বিয়ে হয়। মানুষ হিসেবে সৈয়দ নেহাল ছিলেন একজন উদার মনের মানুষ। তিনি সুফিয়াকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ দেন। সাহিত্য ও সমসাময়িক পত্রিকার সঙ্গে সুফিয়ার যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন তিনি। ফলে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং ধীরে ধীরে তার লেখনী দিয়ে হয়ে ওঠেন সচেতন মনের অধিকারিণী।
বেগম রোকেয়ার কাজ তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয় আর সেই উদ্দীপনা তাকে কলম চালাতে আরও সাহস জোগায়। সমসাময়িক পত্রিকাতে লিখতে থাকেন তিনি। লেখনীর সূত্র আর উন্নত চিন্তা এক করে তার পক্ষে সম্ভব হয় পশ্চাৎপদ নারীদের মধ্যে গিয়ে সেবামূলক কাজ করার। কিন্তু তারুণ্য জীবন পেরোতে পেরোতে তাকে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।
মাত্র ২১ বছর বয়সে স্বামী নেহালের মৃত্যু তাকে জীবনের আরেক অধ্যায় শেখায়। তবে শেষে এসে সহায়তার হাত বাড়ান কামালউদ্দিন খান। এ মানুষটা তার দ্বিতীয় স্বামী। ৩৮ বছরের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গী হয়েছিলেন তিনি। পারিবারিক অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব নিঃশেষ করতে পারেনি সুফিয়া কামালকে। তিনি মেরুদণ্ড সোজা করে জয় করেছেন মানবসত্তা। নিয়মিত কাজ করে গেছেন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য। শুধু সাহিত্যে নয়, বাংলাদেশের জনগণের মনে বেগম সুফিয়া কামাল ধ্রুব প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন তার স্বকীয় স্বভাবগুণে।
সুফিয়া কামাল সংসারকে কখনও প্রাধান্য পেতে দেননি, এমনকি কাব্যকেও জীবন জুড়ে দাঁড়াতে দেননি, খ্যাতি বা প্রতিষ্ঠা গ্রাস করতে পারেনি তার জীবন। তার পটভূমি ও ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল দেশ ও ইতিহাস। দেশের কাজ এবং ইতিহাসের দায় সুফিয়া কামালকে সবসময়ে রেখেছে ব্যস্ত। কঠিন এবং অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছে বারবার। ইতিহাসের কী সব ঘূর্ণিপাকে যখন বহু মণিষীও হোঁচট খেয়েছেন, বোকা হয়েছেন, তখন স্বচ্ছতায় সাবলীলভাবে বাঁক পেরিয়ে সুফিয়া কামাল হয়ে ওঠেন সত্য পথের ধ্রুবতারা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর দমন-নীতির অঙ্গ হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে তিনি তার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাচিত হন এবং আজীবন তিনি এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যেটি বর্তমানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি। এছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশে নারীজাগরণ আর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে গেছেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়েছেন, মুক্তবুদ্ধির পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন। প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন তিনি।
স্বাধীনতার পরও সুফিয়া কামাল অনেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি যে সব সংগঠনের প্রতিষ্ঠা-প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন সেগুলি হলো- 
বাংলাদেশ মহিলা পুনবার্সন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুঃস্থ পুনর্বাসন সংস্থা। এছাড়াও তিনি ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার সভানেত্রী ছিলেন।
সুফিয়া কামাল রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কথা ভেবেছেন, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার বাসনা অনুভব করেছেন। মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সাম্য তার লেখা ও কর্মকাণ্ডে ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করেছে। তার ব্রত ছিল মানুষের কল্যাণে কাজ করা, সত্যের সাধনা করা। সততার সাধনায় সাহস মেলে, অর্জিত হয় চারিত্রিক দৃঢ়তা তাই এগুলোই ছিল তার ব্যক্তিত্বের শিরদাঁড়া।
আগে মেয়েরা ষোল আনা নির্ভরশীল ছিল পুরুষের ওপর। স্ত্রী বা কন্যার কী প্রয়োজন, আর কী প্রয়োজন না, তা স্বামী বা বাবাই নির্ধারণ করতেন। স্ত্রী-কন্যা নীরবে কষ্ট সহ্য করতো এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতো। আর এসব বিষয়ে মেয়েদের সচেতনতা বাড়াতে কাজ করেছেন এই মহীয়সী নারী। বর্তমানে সে পরিস্থিতি কিছুটা কমেছে তবে একদম নেই তা কিন্তু নয়। আসলে মেয়েদের ক্ষেত্রে কত স্তরের দুঃখ যে আছে তার ঠিক নেই। তাই তুলনামূলকভাবে কাউকে কাউকে একটু বেশি সুখী মনে হতো। 
ব্যক্তিত্ব হোক স্বচ্চ আর দৃঢ়, সাহসের সাথে থাকুক সততার সাধনাও। তা হলেই তো নারী প্রকৃতভাবে এগোবে। আর নারী দিবস উপলক্ষে সব নারীর প্রতি সম্মানের পাশাপাশি ছোট্ট একটু বার্তা, নিজে সচেতন হোন, অন্যকেও সচেতন হতে উৎসাহিত করুন। মানুষের উন্নত চেতনাকে আরেকটু জাগিয়ে তুলে, সমাজে পিছিয়ে পড়া নারীদের কিছুটা উৎসাহিত করা উচিত।

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

করোনা ভাইরাস লাইভ ›

লাইভ অনুষ্ঠান বুলেটিন ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
সর্বশেষ সংবাদ
অনুসদ্ধান
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop