ভ্রমণ ‘স্যার, ও স্যার, আমার কথা শুনেন!’

১৬-০৮-২০২০, ০১:২৫

ওয়েব ডেস্ক

fb tw
‘স্যার, ও স্যার, আমার কথা শুনেন!’
ঢেউ এর উত্তাল উন্মাদনা আর বজ্রপাতের শব্দ ছাপিয়ে, বোটম্যান মুসলিম এর কণ্ঠ ভেসে এলো! আমি তখন বোট এর ডেক এ পা দুই পাশে ছড়িয়ে দাঁড়িয়েছি, সেই অবস্থায় ডেকের রেলিং জরিয়ে আছি। আমার এক হাতে একটা দা। আমাদের কাঠের বানানো মাঝারি আকৃতির বোট স্রোতের তোড়ে শূন্যে উঠে আবার যখন পানি স্পর্শ করছে, তখন পেটের ভিতর গুলিয়ে উঠা অনুভূতি। প্রথমত এক ধরণের ভয়, দ্বিতীয়ত- প্যারাসুট এর ক্র্যাস ল্যান্ডিং জাতীয় অবস্থা!
আমরা সুন্দরবনের রুটিন টহলে বের হয়েছি। ইউএসএআইডি এর 'রয়েল বেঙ্গল টাইগার কঞ্জারভেসন' প্রজেক্ট এর অধীনে। সুন্দরবনের পশ্চিম অভয়ারণ্যে আমরা। এই অঞ্চলকে বলা হয় সাতক্ষীরা রেঞ্জ।
গোটা সুন্দরবনের এলাকাকে চারটি রেঞ্জে ভাগ করা হয়েছে। আমরা আমাদের প্রজেক্ট এর অধীনে সাতক্ষীরা রেঞ্জ এর ৭৬৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় টহল দিই। মূলত এই কাজটি করেন বন বিভাগের কিছু চৌকস অফিসার এবং প্রশিক্ষিত বন রক্ষী। কাউন্টার ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাফিকিং, কাউন্টার পোচিং, ল এনফোরস্মেন্ট, কি স্পিসিস মনিটরিং, টাইগার মার্ক রেকর্ডিং এবং অন্যান্য বিভিন্ন মডিউল এর উপর তাঁদের কে মাস ব্যাপী ট্রেনিং করানো হয় গোটা সুন্দরবনের পশ্চিম অভয়ারণ্যে। প্রশিক্ষিত সদস্যদের বলা হয় স্মার্ট পেট্রোলিং টিম। এই স্মার্ট অর্থ স্প্যাসিয়াল মনিটরিং এন্ড রিপোরটিং টিম (spatial monitoring and reporting team)! এই প্রসঙ্গে পরে আরও বিস্তারিত বলবো। এমন একটি টিম এর সাথে আমি এবং আমার সহকর্মী খাইরুল পেট্রোল করতে বের হয়েছি।
বন বিভাগের মোট নয় সদস্য আছেন। তাদের সাথে ৭.৬২ রাইফেল। আর পেট্রোল করার জন্যে সেদিন আমাদের সাথে দুইটি জলযান! একটি ফাইবার গ্লাস এর প্লাস্টিক এর তৈরি পেট্রোল বোট। এর ভিতর ছোট ইঞ্জিন রুম কাম কেবিন। এই বোট ও বি এম (আউট বোর্ড মোটর) এ চলে। এছাড়া রয়েছে একটি মাঝারি আকারের কাঠের বোট। সুন্দরবন এলাকায় এহেন বোট এর সংখ্যা প্রচুর। বোট এর ডিজেল ইঞ্জিন। পিছনে হাল ধরার ব্যবস্থা। বোটের সামনের অংশ ব্রড কিন অর্থাৎ চওড়া। এভাবে বানানো জলযান সাধারণত তৈরি হয় কেবল আভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করার জন্য নদীপথে, সাগরে নয়!
আমরা সুন্দরবনে পেট্রোল করতে যাই মূলত ১৪ দিনের জন্যে। আমরা টানা দুই সপ্তাহ কাজ করি গহীন জঙ্গলে। এরপর দুই সপ্তাহ আবার ডাঙ্গায়। এভাবেই চলে। আমাদের সাথে নিজস্ব কাঠের বোট থাকে। এই যাত্রায় সে বোট কিছু যান্ত্রিক সমস্যা করার কারণে মুসলিমকে তার বোটসহ ভাড়া করতে হয়েছে।
সেদিন যখন আমরা স্থানীয় বন বিভাগ এর ক্যাম্প থেকে পেট্রোল করতে বের হয়েছি, তখন আকাশ পরিষ্কার। সুন্দরবনের পশ্চিম অভয়ারণ্যের অন্যতম প্রধান নদী মালঞ্চ নদী দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সামনের ফাইবার বোটে মূল দল। তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফরেস্ট রেঞ্জার কামরুল হাসান। আমার সহকারী খাইরুল নিজেও ওই বোটে। আমাদের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ওখানেই। জিপিএস, অস্ত্র, স্যাটেলাইট টেক্সটিং ডিভাইস, সব কিছু। পিছনের কাঠের বোটে আমি আর বোট এর চালক। আমার কাছে একটি অয়াকি টকি সেট আছে। সেটা বোটের নীচে কেবিন কক্ষে। আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী মালঞ্চ নদী ধরে জলঘাটা মোড় নামের অংশে যাবো। এটি মূলত একটি জংশন পয়েন্ট। মূল নদীর একটি শাখা এই অংশে খাল হিসেবে উত্তরে চলে গিয়েছে।
সুন্দরবন এর ভিতর সহস্র খাল, মাকড়শার জালের মতো ছড়িয়ে আছে। এই খাল সাধারণ খালের মতো নয়। সুন্দরবনের খালের পানি জোয়ার ভাটার সাথে সংযুক্ত। কারণ এদের সংযোগকারী নদী সব শেষতক বঙ্গোপসাগরে যেয়ে পড়েছে! সুন্দরবনের অনেক খাল বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলে নদীর চেয়ে গভীর এবং চওড়া! জোয়ারের সময় তারা উত্তাল হয়ে উঠে।
'জলঘাটার মোড়' নামক নদী ও খাল এর সংযোগ স্থলে আমরা যখন এসে প্রায় পৌঁছেছি , আকাশ হঠাৎ করে মেঘে ছেয়ে গেলো। বিজলি চমকাচ্ছে, প্রচণ্ড বাতাস। বাতাসে উত্তাল ঢেউ মালঞ্চ নদীকে পাগলা করে তুলেছে। মালঞ্চ কোন সাধারণ নদী নয়, সে সুন্দরবনের নদী। নদীর এক পার থেকে অন্য পাড় প্রায় দেখাই যায় না। গহীন নদী যেখানে কুমির ও অন্য জলজ প্রাণীর বসবাস। সে যেয়ে মিশেছে সাগরে, তাই তার অহংকার বেশি। আর আমরা তখন যে নদী ও খাল এর মোহনায় আছি, সেখানে এমনিতেই জলের ঘূর্ণি বেশি হয়। আজ তো এর উপর ঝড়! আমাদের অবস্থা সঙ্গিন!
ঢেউ এর তোড়ে আমার সামনের বোট এর মানুষদের অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। ওরা আমার থেকে প্রায় আধা কিমি দূরে, খালের মুখে প্রায় প্রবেশ করে ফেলেছে। খালে ঢুকতে পারলেই ঘূর্ণি ও ঢেউ কে এড়ানো যাবে। আর আমি তখন এই কাঠের বোটে। আমার বিনকিউলার ও ওয়াকি টকী নীচে কেবিনে। মস্ত বড় একটা ঢেউ আসে, আমার বোট আকাশে উড়াল দ্যায়! যখন আছড়ে পরে, মনে হয় এই বুঝি কাঠের খোল ফেটে যাবে। কলিজা হিম হয়ে আসে।
আমার বোটের চালক মুসলিম সুন্দরবনে আজ একুশ বছর ধরে বোট চালায়। সে চিৎকার করে বলছে, এই পরিস্থিতিতে এই প্রথম সে। আমাদের বোট যখন উড়াল না দ্যায়, তখন ডানে বামে দুলে আর পানিতে আমরা ভেসে যাই। লোনা পানিতে চোখ জ্বালা করছে। দূরে দেখতে পাচ্ছি ফাইবার বোট প্রায় ডুবে যাবার অবস্থা। বোটে রাখা একটা প্লাস্টিক চেয়ার পানিতে পরে গেলো। আমাদের সকলের পরনে লাইফ জ্যাকেট। কিন্তু এই নদীতে পড়লে প্রথমে ভয় – ভেসে থাকার উপায় নাই। কারণ উন্মাদ আকারের ঢেউ, আর তীব্র ঘূর্ণি। যদিও মাত্র আধা কিমি দূরে পাড়ে সুন্দরবন, কিন্তু সেই আধা কিমি সাঁতার কেটে যাওয়া আদৌ সম্ভব কিনা- ভাবার অবকাশ নাই। এই বিপদে কে কিভাবে সাহায্য করবে, কেবল স্রষ্টা ছাড়া!
ফরেস্ট রেঞ্জার কামরুল ভাই এর টিম প্রায় খালে প্রবেশ করে ফেলেছে দেখতে পাচ্ছি। ঠিক এই সময় সবচেয়ে বড় ওয়েভ (স্রোত) এলো। স্রোত আমাদের বোটকে কয়েক ফুট শূন্যে তুলে যখন আছাড় দিলো, আমরা বাস্তবিক ডুবে গেলাম। আমার মনে আছে আমি কোনমতে তাও রেলিং আঁকড়ে আছি। কিছুক্ষণ বাদে যখন ভুস করে জল সরে যেয়ে শ্বাস নিতে পারলাম, তখন বুঝলাম- আমরা আসলে রাক্ষুসে ঢেউ এ চাপা পড়েছিলাম। ঠিক সে সময়ে মুসলিম এর চিৎকার, "স্যার ও স্যার।"
আমি পিছনে পুরোপুরি না তাকিয়ে ঢেউ এর গর্জন ছাপিয়ে বললাম, “মুসলিম,কি হইসে?”
মুসলিম: স্যার, আমাদের বোট ডুইবে যাচ্ছে। আপনে সামনের বোটরে ডাকেন। আপনে নাইমা যান। এই বোট আর আমি ডুইবে যাইতেসি। আপনে নাইমা গেলে তাও বাইচা যাইতে পারি। লোড কইমা যাবে।"
আমি বুঝলাম মুসলিম এর নার্ভাস ব্রেক-ডাউন হয়েছে। হওয়াই স্বাভাবিক। এহেন অবস্থায় স্বাভাবিক থাকা কঠিন।
আমি আমার হাতের দা উঁচু করে চেঁচিয়ে উঠলাম,
“__________ এর বাচ্চা, কোপ দিয়ে তোর গলা নামায়ে দিমু। বোটের হাল ধর ঠিকমতো। আমি নাইমা যামু এই ঝড়ের ভিতর না? তোরে তোর কোন বাপে বাঁচাইব ? আরেকটা কথা বলবি না!"
আমার গালাগাল খেয়ে মুসলিম এর কিছুটা হুঁশ ফিরল। সে শক্ত হাতে হাল ধরল। দূর থেকে দেখলাম, আমাদের ফাইবার বোট খালের ভিতরে প্রবেশ করেছে, ঐ অংশ শান্ত! আমাদের আরও প্রায় ৩০০ মিটার দূরত্ব বাকী। এখানে দশ মিটার এগোতেও খবর হয়ে যাচ্ছে। তখন বিড়বিড় করে দুয়া পড়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু কোন দুয়া যে পড়বো তা মাথায় আসছে না! মুসলিম চিৎকার করে কাঁদছে আর আল্লাহ নাম নিচ্ছে!
নিজেকে ক্রমাগত সাহস দিচ্ছি, এইতো আরেকটু। ঝড়ের কারণে বোট ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে হয়েছে। আমরা এখন প্রকৃতির করুণার উপরে নির্ভরশীল!
ঠিক সে মুহূর্তে রাক্ষুসে ঢেউ এর দ্বিতীয় ওয়েভ আঘাত হানলো! (চলবে)
সূত্র: ডিফেন্স রিসার্স ফোরাম।

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

করোনা ভাইরাস লাইভ ›

লাইভ অনুষ্ঠান বুলেটিন ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
সর্বশেষ সংবাদ
অনুসদ্ধান
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop