মুক্তকথা ছাত্রলীগ বনাম মৌলবাদী সংগঠন: পার্থক্য কোথায়?

১৫-০৫-২০২০, ১৭:৩৩

আলী আদনান

fb tw
ছাত্রলীগ বনাম মৌলবাদী সংগঠন: পার্থক্য কোথায়?
ফেসবুকে ছাত্রলীগ ভাইদের কয়েকটি অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ চোখে পড়ছে। অভিযোগগুলোর একটি হলো ছাত্রলীগের বেশকিছু নেতা কর্মী দেলোয়ার হোসেন সাঈদী'র মুক্তি দাবি করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে বা এ জাতীয় পোস্টে লাইক কমেন্ট করে সমর্থন দিচ্ছে। দ্বিতীয় অভিযোগটি হলো, ২০১৩ - ১৪ সালে যারা শিবিরের নাশকতার সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িত ছিল তারাই এখন ছদ্মবেশ ধারন করে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছে বা আওয়ামী লীগ নেতাদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়ে গেছে। তৃতীয় অভিযোগটি হলো, ছাত্রলীগের কর্মীরা নিজ দলের বক্তব্য প্রচার, প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের পাল্টা উত্তর দেওয়ার ব্যাপারে সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় না থাকা।
আজ আমরা প্রথম অভিযোগটা নিয়ে কথা বলি। দেলোয়ার হোসেন সাঈদী আদালত কর্তৃক স্বীকৃত একজন যুদ্ধাপরাধী ও দন্ডিত আসামী৷ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে ও নানা ধরনের ঘৃণিত কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন এ কথা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। এ অবস্থায় আজকে যদি কেউ দেলোয়ার হোসেন সাঈদী'র মুক্তি দাবি করে অনলাইনে বা অফলাইনে যেখানেই কথা বলুক না কেন তা অবশ্যই অপরাধ ও আদালত অবমাননার সামিল। একইভাবে সেই বক্তব্যকে সমর্থন করাও অপরাধ।
এটি গেল আইনগত অপরাধের দিক। নৈতিক ভাবে যুদ্ধাপরাধী বা বাংলাদেশ চায়নি এমন কাউকে সমর্থন করা মানে তার দেশপ্রেম না থাকা বা সে আদর্শিকভাবে সংশয়ে আছে তা প্রমাণিত হওয়া। হয় তুমি বাংলাদেশের পক্ষে না হয় বিপক্ষে। এর মাঝামাঝি কোন অবস্থান বা বক্তব্য থাকতে পারে না।
বাংলাদেশে যারা রাজনৈতিক ভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধী বা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামাতের সমর্থক, কর্মী, নেতা- তাদের ব্যাপারে আমাদের সবার অবস্থান ও চিন্তা স্পষ্ট। আমরা জানি, তারা আমাদের আদর্শিক শত্রু ও রাজনৈতিক শত্রু। আমরা অনেক আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছি তাদের সাথে আমাদের অতীতেও হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। রাজনীতির মারপ্যাঁচে কৌশলগত কারণে রাজনৈতিক শত্রুর সাথে অনেক সময় একটেবিলে বসতে হয়। কিন্তু আদর্শিক শত্রুর সাথে প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে এক হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ যদি আদর্শিক শত্রুর সাথে এক হয় বা হওয়ার চেষ্টা করে বুঝতে হবে সে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে।
কথা হচ্ছিল, ছাত্রলীগের সে সকল কর্মীদের ব্যাপারে যারা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী'র মুক্তি চেয়ে পোষ্ট দেয় বা এজাতীয় পোষ্টে লাইক, কমেন্ট করে সমর্থন জানায়। একটা ছেলে সাধারণত ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয় এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। সেক্ষেত্রে ধরা যাক তার বয়স তখন থাকে পনের বছর। যদি সে স্কুল জীবনে রাজনীতিতে হাতে খড়ি হওয়ার সুযোগ পায় তাহলে তার বয়স হতে পারে ধরে নিলাম তের বছর। গঠণতন্ত্র অনুযায়ী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সুযোগ আছে উনত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত। এদিক ওদিক করে একজন ছাত্রলীগ কর্মী ত্রিশ বত্রিশ বছর পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকে। 
সেদিক থেকে বলা যায় বর্তমানে যারা মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় আছে তাদের বয়স পনের থেকে ত্রিশ বছর। যার বয়স পনের তার জন্ম হয়েছে ২০০৫ সালে। সে যদি বারো বছর বয়সে রাজনীতিতে সক্রিয় হয় তাহলে সেই সময়টা ছিল ২০১৭ সাল। অাওয়ামী রাজনীতির ইতিহাসে সে সময়টা দলের স্বর্ণযুগ। আবার যার বয়স পঁচিশ বছর তার জন্ম হয়েছে ১৯৯৫ সালে। যিনি ১৯৯৫ সালে জন্ম নিয়েছেন তিনি কোন ভাবেই ২০১০ সালের আগে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আগ্রহী হওয়ার সুযোগ নেই। তার আরো বছরখানেক আগে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। ভাতৃ সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ সকল দুর্যোগ কাটিয়ে উঠেছে।
এত কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, দেশের বিভিন্ন জায়গায় আজকের দিনে (২০২০ সালে) যারা ছাত্রলীগ রাজনীতির তৃণমূলে জড়িত বা বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ করছে তারা অধিকাংশই বয়স পনের ষোল থেকে পঁচিশ ছাব্বিশের মধ্যে। অর্থাৎ তারা আওয়ামী লীগের কোন দুঃসময় দেখেনি। বা ইতিহাস তাদের অনেকের উপর কোন প্রভাব ফেলেনি। পাশাপাশি তারা চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র সম্পর্কে কোনরকম ধারণা অর্জন করতে পারে নি।
তবে হ্যাঁ, যাদের বয়স পঁচিশ থেকে বত্রিশ, অর্থাৎ যারা ১৯৯৫ সালের আগে জন্ম নিয়েছেন, এবং পারিবারিক প্রভাব, কোন না কোন ছাত্ররাজনীতি সম্পৃক্ত আত্মীয় স্বজন বা এলাকার বড় ভাইয়ের সান্নিধ্য পেয়েছেন বা পারিবারিক ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে ইতিহাস সচেতন, আদর্শিকভাবে যারা অটল তাদের ব্যাপার ভিন্ন। 
পনের থেকে পঁচিশ বছর বয়সী যারা অফলাইনের রাজনীতির চেয়ে অনলাইন রাজনীতিতে বেশী সক্রিয় - তাদের ব্যাপারেই হয়তো অভিযোগটা কিছুটা বেশী। আমি আবারো বলছি, ঢালাও অভিযোগের পক্ষপাতী আমি নই। এদের মধ্যে অধিকাংশই আদর্শিক ছাত্ররাজনীতিতে বিশ্বাস করে এবং অনেক বড় স্বপ্ন ও দেশপ্রেম নিয়ে ছাত্রলীগ করছে। কিন্তু বাধ সেধেছে গুটিকয়েক নিয়ে। যারা আমার এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য। অর্থাৎ তারা ফেসবুকে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী'র মুক্তি দাবি করে স্ট্যাটাস দিচ্ছে বা এর সমর্থনে লাইক, কমেন্ট করছে। 
এর আগে তারা ইসলামী ওয়াজের ছদ্মবেশে জামাতের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করছে ও নানা ধরনের প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে এমন ওয়াজের ভিডিও ছাত্রলীগের কাউকে কাউকে শেয়ার দিয়ে সমর্থন জানাতে বা সেসকল মাওলানার পক্ষ নিয়ে অন্যের সাথে তর্কে লিপ্ত হতেও আমরা দেখেছি। যা খুবই দুঃখজনক।
প্রশ্ন হচ্ছে এই পরিস্থিতির দায়ভার কার? উত্তরে বলব দায়ভার আমাদের সবার। আমরা আমাদের কর্মীদের বা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দর্শনগত দিক থেকে কোন বার্তা দিতে পারি নি। তাদের চেতনাগতভাবে সমৃদ্ধ করতে পারি নি। বা তেমন কোন পরিকল্পনা আমাদের আছে বলেও মনে হয় না। একজন কিশোর বা তরুণ যখন ছাত্রলীগ করে আমরা তাদেরকে কী কখনো জিজ্ঞেস করেছি, তুমি কেন ছাত্রলীগ কর? তুমি কেন ছাত্রদল না করে, ছাত্রফ্রন্ট বা ছাত্র ফেডারেশন না করে,  বা অন্য অনেক ধর্মীয় ছাত্র সংগঠন না করে কেন ছাত্রলীগ করতে এলে? সচরাচর এমন প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের কর্মীদের হতে হয় না। ঐ ছাত্রলীগ কর্মীকে যিনি রিক্রুট করেছেন তিনি কখনো তার কর্মীকে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি করেন নি।
এই সময়ে তৃণমূলে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত এমন অনেককে প্রশ্নটা করে আমি নিজেও কোন সদুত্তর পাইনি। কেউ কেউ মুখে জড়তা রেখে বলেছেন, ছাত্রলীগ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সংগঠন। তাই ছাত্রলীগ করি। ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ’  - কথাটার অর্থ কী? বা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত ব্যাখ্যা কী? আমরা যে কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি - তার প্রকৃত স্বরূপ কী? এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কোন চর্চা করিনি বা চর্চা অব্যাহত রাখতে পারিনি। বা সহজ ভাষায় আরো বলা যায়, চর্চাটুকু আমরা শুধুমাত্র কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা পত্রিকার গুরুগম্ভীর কলামিস্টের টেবিলেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। তার বাইরে আমরা নিতে পারিনি। 
এই চর্চা যারা করেছে তাদের আমরা 'তাত্ত্বিক' ডেকে গালি দিচ্ছি। যদিও 'তাত্ত্বিক' কোন গালিসূচক শব্দ হওয়ার কথা ছিল না। হ্যাঁ, একজন ছাত্রলীগ কর্মী অতি তাত্ত্বিক হয়ে টেবিলে মুখ গুঁজে বসে থাকবে সেটাও কাম্য নয়।
একজন কিশোর বা তরুণ যখন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়ায় তাকে সাধারণ ভাবেই কিছু পড়াশোনা করানো উচিত। বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা' তার অন্যতম। আমি বিভিন্ন ইউনিটের অনেক প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারীর সাথে কথা বলে দেখেছি, কর্মীরাও এ ব্যাপারে উৎসাহী নয়, নেতারাও তাদেরকে উৎসাহী করার ক্ষেত্রে খুব একটা আগ্রহী নয়। এরপরেই একজন ছাত্রলীগ কর্মীকে বাংলাদেশের ইতিহাসটা ভালভাবে পড়া উচিত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ অভ্যুথান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫- এর ১৫ আগস্ট ও তার পরবর্তী নানা ঘটনা প্রবাহ, আশি দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ওয়ান ইলেভেনকালীন নানা দিক - সবকিছু সম্পর্কেই ছাত্রলীগের একজন কর্মী সচেতন থাকা উচিত। 
পণ্ডিত হওয়ার কথা বলছি না, কিন্তু সাধারণ সচেতনতাবোধ অবশ্যই থাকা উচিত। 
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে গেলেই সে বুঝবে 'অসাম্প্রদায়িকতা' কী বা 'ধর্মনিরপেক্ষতা' বলতে আমরা কী বুঝি? স্পষ্ট হয়ে যাবে বিভিন্ন ধর্মীয় লেবাশধারী ছাত্রসংগঠণগুলোর সাথে ছাত্রলীগের পার্থক্যটা কোথায়? (চলবে)
লেখক: আলী আদনান
সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

stay home stay safe
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop