মুক্তকথা ইংল্যান্ডের প্লেগ মোকাবেলা ও কোভিড-১৯ এর শিক্ষা

১৩-০৫-২০২০, ২০:২২

ডঃ জহির আহমেদ

fb tw
ইংল্যান্ডের প্লেগ মোকাবেলা ও কোভিড-১৯ এর শিক্ষা
১৫৬৫-৬৬ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের মহামারী ইতিহাসে মর্মন্তদ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। এই মহামারী লন্ডন ও কেম্ব্রিজে সীমিত ছিল এবং পরে ১৫০ মাইল দূরে ইম (Eyam) গ্রামে সংক্রমিত হয়। কীটের মাধ্যমেই মানব শরীরে ওই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে এবং পরবর্তীতে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটে দ্রুততার সাথে। মূলত মাছির কামড়েই এই সংক্রমণ প্রথমে ঘটে। প্লেগ এর পরিবর্তন ঘটে দ্রুত বেগে এবং ১৫৬৬ সালে তা মহামারীর রূপ নেয়।
ডারবিশাইয়ার  প্রত্যন্ত একটি গ্রামের নাম ইম। ছোট্ট এই গ্রামের ৭৫০ জন মানুষের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মানুষ (২৬০ জন) এই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। এই মহামারীর  সংকটে স্থানীয় অধিবাসীদের যে অকুতোভয় ছিল এবং পার্শের গ্রামবাসীদের কে যেন প্লেগ আক্রমণ করতে না পারে তার নানান উদ্যোগ নেয়- তা আজকের করোনাকালেও প্রত্নতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ এবং নৃবিজ্ঞানীদেরকে উদ্দীপ্ত করে।
পুরো গ্রামবাসীরা বীরোচিতভাবে চৌদ্দ মাসের আত্ম-আরোপিত কোয়ারান্টাইনে চলে যায় এবং প্লেগকে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে ইম গ্রামের মাঝেই আটকিয়ে দেয়। বর্তমানে ইম অধিবাসীরা তাদের পূর্বসূরিদের এই গৌরবোজ্জ্বল আত্মাহুতি স্মরণ করে এই বলে যে, ওই সময়ে তাঁরা নিজ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাননি; মহামারীতে থেকেই তারা তা প্রতিরোধ করতে চেয়েছেন; আজকের করোনা মহামারীর মতই তখন কোন ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি কিন্তু পূর্বসূরিরা কিছু কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। নিম্নে আমি নৃবিজ্ঞানী সিল্ভারমান এবং সার্চ ইঞ্জিনে কিছু ঐতিহাসিক তথ্য, গার্ডিয়ান পত্রিকার ফিচার, ২০১৭ সালে আমার একটা গবেষণার সুবাদে ম্যানচেস্টার ও বারনলের গ্রামে এ সম্পর্কে কিছু বীর গাঁথা শোনা  এবং সাম্প্রতিক বিবিসি’র কিছু ডকুমেন্ট এর সাহায্য নিয়ে এই বিষয়ে আলোচনা করতে আমাকে উৎসাহ যোগায়।
ইম গ্রাম:
ইংল্যান্ডের ডার্বিশাইয়ারের কাছে (পাশেই ম্যানচেস্টার) পাথরের দালানে নির্মিত বসতবাটিগুলো আর আঁকাবাঁকা পাথরে ঢালাই সরু পথগুলো যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। সবুজ প্রকৃতি, আকাশ ছোঁয়া গাছ-গাছালি আর উঁচু-নিচু পাহাড় পরিবেষ্টিত গ্রামটির নান্দনিক সৌন্দর্য ইংল্যান্ডের টিপিক্যাল কান্ট্রি সাইডের কথা মনে করিয়ে দেয়। মহামারীকে কেন্দ্র করে এই গ্রামের মানুষের আত্মত্যাগের নিদর্শন দেখতে এখনো প্রচুর পর্যটক আসে। একজন ব্রিটিশ সহকর্মীর সাথে আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী সিল্ভারমান ২০১৩ সালে এখানে গবেষণা করেন। তাঁর মতে, ইম মহামারিতে ইংরেজ কম্যুনিটির নৈতিক শিক্ষা এই করোনা দুঃসময়েও আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে আছে। তাঁর বক্তব্য গুলো নিম্নরূপ।
জেনেটিক প্লেগ সম্পর্কে ইম এর অধিবাসীদের তেমন ধারণা ছিল না। তবে তারা এটি জানত যে, এই মহামারী সংক্রামক এবং প্রাণঘাতী। ইমের গির্জার রেকটর মম্পেসন আতঙ্কিত জনগণকে  বোঝাতে চেষ্টা করেছেন ঘরের মধ্যে থাকতে। তিনি সফল ও হলেন। পুরো গ্রাম ১৪ মাসের আরোপিত গৃহবন্দী হয়ে রইল। এর ফলে অনেক জীবন বেঁচে গেল। কিন্তু ইম-কে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। নৃবিজ্ঞানী সিল্ভারমানের মতে, “ দিনের পর দিন মা, বাবা, পুত্র কন্যা মারা যাচ্ছিল। বেশ কিছু পরিবার পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেল। মৃতদের লাশ কবরস্থানে না নিয়ে বাড়ির সন্নিকটে দাফন করা হয়েছিল; গির্জা বন্ধ ঘোষণা করা হল; মৃতদের জন্যে গির্জায় সার্ভিসের ব্যবস্থা না করে খোলা আকাশের নিচে আয়োজন করা হয়েছিল- যাতে গা ঘেঁষে কেউ দাঁড়াতে না পারে।
জানা যাক, ৩৫০ বছর আগে মহামারী মোকাবেলার স্বরূপ কি ছিল? নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব আর ইতিহাসের সাহায্য নিয়ে আজকের কোভিড-১৯ কে আমরা আমাদের প্রেক্ষাপটে কিভাবে মূল্যায়ন করব এবং কি কি পূর্ব-সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিব?  
 
ইম গ্রামে এই প্লেগ কিভাবে এল?
ইম গ্রামে এই প্লেগ আসে লন্ডন থেকে ১৫৬৫ সালে। লন্ডনে প্রচুর লোক ইতিমধ্যে এই মহামারীতে মারা যান। এই প্লেগ আসে মাছি জাতীয় এক প্রকার কীটের মাধ্যমে। এই কীট স্যাঁতস্যাঁতে কাপড়ের গাঁটের সাথে লেগে ছিল। ইম গ্রামের দর্জি এই থান কাপড় লন্ডন থেকে এনেছিল তার ব্যবসার জন্যে। দর্জির সহকারী জর্জ ভিকারস এই কাপড়ের গাঁট রোদে শুকোতে দেন এবং মাছির কামড়ে আক্রান্ত হন। জর্জই প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি এবং প্রথম মৃত ব্যক্তি যিনি ইম গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন। ১৫৬৫ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান এবং গির্জার পাশেই সমাহিত হন। তার পর পরই তার মালিক দর্জি আলেকজান্ডার ও তার দুই সৎপুত্র মারা যান। শুধু তাঁর স্ত্রী বেঁচে ছিলেন।
এই সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। ১৫৬৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ৪২ জনের প্রাণহানি ঘটে। এবং ১৫৬৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও ২২০ জন মারা যান। অনেক গ্রামবাসী প্লেগের শুরুতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং জীবন-জীবিকা রক্ষার জন্যে পাশের গ্রামে চলে যেতে সিদ্ধান্ত নেয়।  কিন্তু ইম গ্রামের জাদুঘরের তৎকালীন রেকটর উইলিয়াম মম্পেসেন হস্তক্ষেপ করেন এর বিপক্ষে।নিজের দায়িত্ববোধ থেকে তিনি ভাবেন যে, পার্শ্ববর্তী শেফিল্ড এবং বেকওয়েল শহরের বাসিন্দারা এর ফলে সংক্রমিত হবে।
মম্পেসেন ভাবল গ্রামটিতে সেলফ- কোয়ারানটাইনে যাওয়াই উত্তম পথ। ১৫৬৬ সালের ২৪শে জুন, মম্পসেন বলেন যে, পুরো গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে-কেউই গ্রামের ভিতরে-বাইরে চলাচল করতে পারবেনা। পাশের গ্রাম ডেভনশাইয়ার এবং চ্যাটসওয়ারথ এর অধিবাসীরা প্রস্তাব দিল যে, যদি এমবাসীরা কোয়ারেন্টাইনে যেতে রাজি থাকে, তবে তারা নিত্য সামগ্রী, খাবার সহ, সরবরাহ করবে। আর মম্পেসেন ঘোষণা করলেন যে, অধিবাসীরা যদি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে গ্রামেই থাকতে চায় তবে তিনি তাঁর ক্ষমতাবলে সব ধরণের সহযোগিতা করবেন, দুঃখ-কষ্ট লাঘব করবেন এবং নিজের জীবনও এই প্লেগে উৎসর্গ করবেন।
নতুন দায়িত্ব পাওয়া এই কিউরেটর এর কথায় কেউ আশ্বস্ত হতে পারছিলনা। পূর্ববর্তী জনপ্রিয় কিউরেটর থমাস ইসটানলিকে সাথে নিয়ে গ্রামবাসীদেরকে তিনি বুঝালেন যে, গ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়া সমাধান নয়; বরং ঘরবন্দী হয়ে এই প্লেগকে  ঘরের মধ্যে আটকানো হবে সব অর্থেই মঙ্গল। এতে নিজে এবং পাশের গ্রামের মানুষকে সুরক্ষা দেবে। ফ্রাঞ্চিনক্লিফোর্ড নামক একজন স্থানীয় ইতিহাসবিদ বলেন, এই সংকটের দিনে মম্পেসেন এবং ইসটানলি ইম সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয় অবতার হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁরা দু’জনেই খ্রিষ্ট ধর্মের মূল্যবোধের বাণী দিয়ে বুঝাতে সক্ষম হন যে, মানব জাতির মঙ্গলের জন্যে ইম গ্রামবাসীদের কিছু একটা করা নৈতিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেন; যীশু সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্যে নিজের জীবনকেও উৎসর্গ করেছিলেন। ইমবাসীরা এই পরিকল্পনায় ব্যাপক ভাবে সাড়া দিয়েছিল। এর ফলে ইম গ্রামের ভয়াবহ দুর্যোগের হাত থেকে শুধু রক্ষাই পায়নি, বরং পাশের অঞ্চল এমনকি পুরো ইংল্যান্ড এই মহামারী থেকে অনেকটাই রক্ষা পেয়েছিল। দেখা যাক, কোয়ারানটাইন সময়ে কি ধরণের তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবস্থা ইম গ্রামে অনুশীলন করা হত?
পুরো ইম গ্রামকে পাথরবেষ্টিত করে সীমানা নির্ধারণ করে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। পাশের গ্রামবাসীরা ওই পাথরের ধারে খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী রেখে দিত। বিনিময় হিসেবে ইম বাসীরা বিশাল পাথরের উপর কয়েকটা ছোট ছোট গর্ত করে ভিনেগার রাখত এবং মুদ্রা গুলো সেখানে রেখে দিত। পাশের গ্রামের মানুষেরা নির্ধারিত মূল্য নিয়ে নিত। ইমবাসীদের ধারণা ছিল যে, ভিনেগার থেকে মুদ্রা তুলে নিলে ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকত না।   
মম্পেসেন প্রতিটি আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসেব সযত্নে রেজিস্ট্রারে রেকর্ড করতেন। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, পুরো পরিবারের সদস্যরা স্বল্প সময়ে একের পর এক মারা যাচ্ছে। ১৫৬৬ সালের আগস্ট মাসে ইম গ্রামে দিনে ৬-৭ জন করে মানুষ মারা যাচ্ছিল। ১৫৬৬ সালের নভেম্বরের ২০ তারিখে লেখা চিঠিতে মম্পসেন আবেগ তাড়িত হয়ে লিখেন, “ আমার কান কখনো সেই বেদনার্ত মাতম শুনেনি; আমার নাক কখনো ভয়ঙ্কর সেই দুর্গন্ধ শুঁকেনি; আমার দুচোখ কখনই সেই বিবর্ণ দৃশ্য এর আগে অবলোকন করেনি”।
মম্পেসনের মাধ্যমে নৃবিজ্ঞানী সিল্ভারম্যান জানান যে, একই মাসে এলিজাবেথ হানকক তাঁর ছয় সন্তান সহ স্বামীকে ঘরের অদূরে পারিবারিক খামারে কবরস্থ করেন একাই এবং এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে আট দিনের ব্যবধানে। এখানেই শেষ না এই ট্র্যাজেডির। পার্শ্ববর্তী স্টোনি মিডলটন এর বাসিন্দারা পাহাড়ের চূড়া থেকে হানককের টেনে হিঁচড়ে নেয়া লাশ ও কবর খোঁড়ার দৃশ্য দেখছিল অসহায় ভাবে। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ভয়ে কেউই এগিয়ে আসেনি। ইম জাদুঘরে আঁকা এই চিত্র আজকের সবাক মানুষকেও নির্বাক করে দেয়।
আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার লাশ সৎকারে অন্যের (ব্যক্তি/আত্মীয়/প্রতিবেশী) দৃষ্টিভঙ্গি যে কত নির্মম হতে পারে তা ইম প্লেগের হতভাগ্যদের ঘটনা দেখলেই মনে হয়। এটাই বোধ হয় মহামারীকালীন বাস্তবতা। অপর বেঁচে যাওয়া মার্শাল হো-কেও নিজ পরিবারের সদস্যদেরকে একাই কবরস্থ করতে হয়েছিল। ইম গ্রামে হো’র দায়িত্ব ছিল লাশ কবরস্থ করার। মহামারীর শুরুতে সে আক্রান্ত হলেও সুস্থ হয়ে উঠেছিল। নতুন উদ্যমে হো তার কাজ করে যাচ্ছিল; বিশ্বাস ছিল সে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবেন না।
১৫৬৬ সালের ২২ শে আগস্ট এ লেখা চিঠিতে মম্পেসন লিখেন যে, তিনি আর তার সহধর্মিণী কাথেরিন (২৭) সহ নিকটস্থ পাহাড়ের চূড়ায় হাঁটতে যেতেন। প্রতিবারই তাঁর মনে হয়েছে তিনি ব্যাকটেরিয়া বহনকারী মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষ। তার পরদিনই কাথেরিন মারা যান। তিনি আতংকিত ছিলেন প্রতি পদে পদে। তবে স্বর্গীয় স্থানে তাঁর গন্তব্য হবে- এটিও মনে করতেন । তিনি লিখেছেন, “তবুও তবুও...এই পথে মৃত্যু সুখকর নয়। আমি মরে যাব যন্ত্রণায়, এবং আমার চারপাশে এত মানুষ, আমার এত ক্ষমতা--কিন্তু কেউই আমার জন্যে কিছু করতে পারবেনা”।
গবেষণা ফলাফল:
কোভিড -১৯ এর প্রেক্ষাপটে ইতিহাসবিদ এবং নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, আমাদের অনেক শেখার আছে ইম বাসীদের কাছ থেকে। ইতিহাসবিদ ক্যারল সিমস এর মতে, “quarentena,” থেকে  “quarantine” শব্দটি এসেছে। মধ্যযুগের ভেনেতিয়ান শব্দ অর্থ হল, মহামারীর সময়ে ৪০ দিন যাবত আলাদা থাকতে হবে। তাঁর মতে, “পরিবেশ বিপর্যয় থেকে প্লেগ এবং কোভিড -১৯  উদ্ভূত; দুটোই বৈশ্বিক ভাবে যুক্ত এবং দুটোই জীবজন্তুর উপর ভর করে এসেছে। আবার দুটোরই উৎপত্তিস্থল চীন দেশ। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে মঙ্গোলদের বিজয়ের সাথে সাথে প্লেগ এসেছে। মধ্যযুগের জলবায়ুর উষ্ণতার শেষ দিকে ঠাণ্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাবে এই প্লেগ বিস্তার লাভ করে। একই অবস্থা আমরা দেখি যে, কোভিড -১৯ চীন তথা এশিয়া থেকে উদ্ভূত যা এখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যারল সিমস আরও বলেন, ইহুদীরা যেমন ভাবে ওই প্লেগের বলির পাঁঠা হয়েছিল ইউরোপিয়ানদের দ্বারা, একইভাবে  কোভিড -১৯ এর জন্যে করা হচ্ছে চীনকে।
প্রত্নতাত্তিক ও নৃবিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ৩৫০ বছর আগে ইঁদুর বাহিত কীটের মাধ্যমে প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার কারণে বেশি মানুষ মরেনি। বরং, ‘মানব শরীর থেকে মানব শরীরে সংক্রমণ’ সেটি ঘটেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এর মহামারী বিষয়ক গবেষক জাভিয়ার ডিডেলট জানান যে, ১৪ মাসের গৃহবন্দী জীবনে কিছু পরিবারের সব সদস্যরা মৃত্যুবরণ করেছে। তবে ইমবাসীর স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী জীবন ঐতিহাসিকভাবে কোয়ারান্টাইনের ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকবে (২০১৬; ২০২০)।  
এই নতুন গবেষণায় আমরা জানতে পারি যে, ৬৮৯ জন গ্রামবাসীদের ২৫৭ জন এই প্লেগে মারা যান। তাদের মধ্যে ২৫% ইঁদুর বাহিত মাছি দ্বারা আক্রান্ত হন। তবে ছোঁয়াচে বিধায় মানুষের মাধমেই এই প্লেগের বিস্তারণ ঘটে। এই গবেষকরা আরও জানান যে, ইমবাসীদের দুঃসাহসিক গৃহবন্দী জীবন এই ব্যাকটেরিয়াকে আটকাতে সমর্থ হন। ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষণা আরও জানায় যে, প্লেগের শিকার ছিল শিশু ও দরিদ্র শ্রেণির গ্রামবাসীরা। সম্পদশালীরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করত এবং অসচ্ছলদের সাথে তাদের তেমন কোন সামাজিক সংস্পর্শ ছিলনা। তুলনামুলকভাবে কম মানুষ শীতকালে মারা যায়। গবেষকদের মতে, এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে শীতকালে ইঁদুরের সংখ্যা কম ছিল। আবার এটাও হতে পারে যে, মানুষ ঘরের মধ্যে বন্দী ছিল বিধায় সামাজিক সংস্পর্শ একেবারে ছিলনা।
প্লেগে আক্রান্ত ইম গ্রামের কতক বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ ছিল:  
এক/ ইম এ প্লেগ আসার পরপরই অধিবাসীরা সিদ্ধান্ত নিল যে, পালিয়ে না গিয়ে তারা কোয়ারানটিনে চলে যাবে। এবং অন্তরিনে থেকেই নিজেদের সুরক্ষা করবে।
দুই/ ইম অধিবাসীদের যুগান্তকারীসিদ্ধান্তপাশের এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়েনি। আরোপিত ঘরবন্দী একটি মডেল হিসেবে এই করোনা যুগেও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৪ মাসের কোয়ারান্টাইনে ইমবাসী এই মহামারী থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পায় এবং ইংল্যান্ড কে রক্ষা করে।
তিন/ গ্রামবাসীদের স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ছিল অগাধ। একজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি বলেন, প্লেগটি অবশ্যই ভয়ঙ্কর ছিল। কিন্তু প্রতিটি পরিবার খ্রিস্ট ধর্মের মানবতার দীক্ষায় উদ্বুদ্ধ ছিল এবং মৃত্যুকে ভয় করতনা। মনোবল ছিল তাদের বেঁচে থাকার শক্তি।
ক্লিফোর্ড বলেন,  সংকটের সময়ে সমাজ সম্প্রদায়ের জন্যে ইম বাসীদের আত্মবিসর্জনের যে নজির আমরা পাই, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী আজও মানুষ স্মরণ করে। আজও  সম্প্রদায় কেন্দ্রিক ইম গ্রামের ১০০০ জনগোষ্ঠী জনসেবার ব্রত নিয়ে বসবাস করছে। ডার্বি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্য প্রাণীর রোগ বিষয়ের অধ্যাপক মাইকেল সুইট মনে করেন যে, ইম গ্রামে কোয়ারানটাইন এর অর্থ ছিল, মানুষে মানুষে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরন (বিশেষত: বাইরের গ্রামের সাথে), যা ১৪ মাস যাবত বন্ধ করে দেয়া  হয়েছিল। এর ফলে তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যাকটেরিয়া ছড়ানো নিয়ন্ত্রিত হল। এটি প্রমাণিত হল যে, ভ্যাকসিন এর আবিষ্কার না হলেও প্রিভেনটিভ মেজার হিসেবে মানুষের নিজেদের মধ্যে আইসোলেশন এর গুরুত্ব রয়েছে সর্বাধিক। ১৫৬৬ সালের আগস্ট মাসে  আক্রান্তের সংখ্যা সব চেয়ে বেশি ছিল। আবহাওয়া ছিল গরম। ফলে মাছি ছিল খুব তৎপর এবং ইম গ্রামের সর্বত্র তারা দৃশ্যমান ছিল। তারপরেও, মানুষ ঘরের বাইরে যেত না।
শেষ কথা:
অবশেষে, ১৫৬৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর প্লেগের তীব্রতা কমে গেল। নভেম্বরের শুরুতে মহামারীর প্রকোপ আর থাকল না। মানুষের চলাচলে পাথরের করডন (আজকের করোনাকালীন  ‘লক ডাউন’) কাজে লেগেছিল। মহামারী চলাকালীন সময়ে লন্ডনের চাইতে ইম এ মৃত্যুহার অনেক বেশি ছিল। ৭৬ টি পরিবারের ২৬০ জন মানুষ মারা যায়। ঐতিহাসিকদের দাবী, প্রায় ৮০০ অধিবাসী ইম গ্রামে বসবাস করত। ৩৫০ বছরের অধিক কাল পেরিয়েছে। ইম এর মানুষের স্মৃতিতে মর্মন্তদ প্লেগের অভিশাপ এবং নিজেদের আত্মত্যাগ স্মৃতিতে আজও ভাস্বর হয়ে আছে।
নৃবিজ্ঞানী সিল্ভারমানের কাছে বর্তমানের ইমবাসীরা বলেন যে, “ইমের নৈতিক  শিক্ষা হলঃ যদি সমাজ জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে মানুষ স্বার্থপরহীনভাবে ত্যাগ স্বীকার করে, সমষ্টিগত অর্থে ধৈর্য ধারণ করে, পরোপকারী হতে পারে, তবেই আশা জাগবে, সংকট কেটে যাবে। যেমন করে আমরা ভাল মানুষ পাব, তেমনি ভাল জাতিও পাব”। বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ইম গ্রামের লড়াকু মানুষের মানবতাবাদী পদক্ষেপ আমরাও নিতে পারি- যেখানে রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ আর জনগণ বেঁচে থাকার জন্যে ত্যাগ স্বীকার করবে। বলা বাহুল্য, আমাদের ধর্ম-সমাজ-সংস্কৃতিতে সেই মতাদর্শগত দীক্ষা এবং প্রাত্যহিক প্রণোদনা আছেও।
লেখক:
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

stay home stay safe
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop