মুক্তকথা করোনাকাল: একটি অবহেলিত জনপদের স্বাস্থ্য বিভাগ ও একজন চিকিৎসক

১২-০৫-২০২০, ২০:০০

শাহিদুল হাসান খোকন

fb tw
করোনাকাল: একটি অবহেলিত জনপদের স্বাস্থ্য বিভাগ ও একজন চিকিৎসক
ভীষণ একটা যুদ্ধ চলছে বিশ্বজুড়ে। হ্যাঁ, করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথাই বলছি। আর এই যুদ্ধে সামনের সাাড়িতে দাঁড়িয়ে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা হলেন ডাক্তার। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ডাক্তারদের মাঝেও আতঙ্কটা কম নয়। ডাক্তাররা অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এসব আতঙ্ক নিয়েই নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মানুষের জন্য লড়াই করে চলেছেন দেশের ডাক্তাররা।
করোনাকালে পরিচয় ঘটল একজন মানবিক ও দেশপ্রেমিক ডাক্তারের সাথে। তিনি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মকছেদুল মোমিন।
সম্প্রতি দীর্ঘদিন পর ব্যক্তিগতকাজে ২ দিন যেতে হয়েছে আমার নিজের উপজেলা মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ১৭ এপ্রিল গিয়েছিলাম অনেক রাতে। সেদিনই মূলত: প্রথম পরিচয় হয়েছিল ডা. মকছেদুল মোমিনের সাথে। কিন্তু রাতের কারণে ওখানে অবস্থান ও আলাপটা ছিল ক্ষণিকের। দ্বিতীয় দফায় যাই ২ মে সকালে। দিনের বেলায় হাসপাতাল কমপ্লেক্সে যাওয়া প্রায় ২০ বছর পরে।
এই ২০ বছরের বিভিন্ন সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের কল্যাণে গণমাধ্যমে পড়েছি একটা জরাজীর্ণ হাসপাতালের খবর। তাই চোখের সামনেও ভেসেছে একটা জরাজীর্ণ চিত্রই। কিন্তু এবার হাসপাতালে গিয়ে চোখের দেখাটা একেবারেই ভিন্ন। বদলে গেছে পুরো হাসপাতাল কমপ্লেক্স। হাসপাতাল কমপ্লেক্সে অবস্থানরতদের সাথে কথা বলে জানলাম এর কারিগর বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মকছেদুল মোমিন। তিনি এখানে এই পদে যোগদানের পরই মূলত বদলে গেছে জরাজীর্ণ হাসপাতালের চিত্র।
গণমাধ্যমে ভাষায় গোচারণ ভূমিতে আর গরু চড়ে না এখন। নিরাপত্তা বাউন্ডারি সংস্কার করায় সেখানে গরু-ছাগলের প্রবেশের সুযোগ নেই। যারা গরু-ছাগল চড়াতেন তাদের কথা বিবেচনা করে ভেতরে ব্যবস্থা হয়েছে ঘাস আবাদের। সময় ধরে সেটা কেটে নিয়ে যাচ্ছেন গরু-ছাগল মালিকরা।
হাসপাতালের মূল ভবনের সামনে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল ফুলের বাগান। বাহারি পদের ফুল গাছে ভরে ফেলা হয়েছে বাগান। হাসপাতালের নোংরা গন্ধের পরিবর্তে সেখান থেকে ছড়াচ্ছে ফুলের সুগন্ধ। আগে কমপ্লেক্স ভবনে থাকতেন না আবাসিক ডাক্তাররা। আবাসিক এলাকাটাকে সমৃদ্ধ করতে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে মিনি পার্কসহ ছোট ছোট স্থাপনা। আবাসিক কর্মকর্তারা সেখানে সুযোগ পাচ্ছেন শাক-সবজি উৎপাদনের।
গ্রামের মানুষ দূর দূরান্ত থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে আসেন স্বাস্থ্যসেবা নিতে। এসব সাইকেল চুরি ঠেকাতে গড়ে তোলা হয়েছে সাইকেল স্ট্যান্ড। আবাসিক/অনাবাসিক রোগী, কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে মসজিদ। অনাবাসিক রোগীদের জন্য করা হয়েছে ওয়েটিং জোন।
ডা. সাহেবের পরিকল্পনা থেকে বাদ যায়নি বিষ খাওয়া রোগী আর মৃত মানুষের গোসলের চিন্তাও। গ্রামঞ্চলে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা নিত্যদিনের ঘটনা। এসব রোগীদের খোলা যায়গায় শুইয়ে চিকিৎসা করা হত। এখন এসব রোগীদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে আলাদা স্থান। পাশেই মৃত মানুষের গোসলের ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য সেবাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। বিস্তৃর্ণ ফাঁকা জায়গায় সারি সারি লাগানো হয়েছে কমলার গাছ।
হাসপাতাল কমপ্লেক্স স্থাপনের পর কয়েক ডজন কর্তা এসেছেন এখানে। এতদিনে এসব কেন হলো না? তিনিই বা কেন পারলেন এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হল ডা. মোমিনের সঙ্গে। বড় দা সুব্রত সরকারকে (দৈনিক সংবাদের স্থানীয় প্রতিনিধি) সাথে নিয়ে গেলাম ভদ্র লোকের কক্ষে। করোনাকালেও বেশ কিছু রোগী লাইনে দাঁড়িয়ে রুমের সামনে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের যে কত ক্ষমতা সেটা তৃণমূলে না গেলে আসলে বোঝা যায় না। সুব্রত সরকারকে দেখতেই তিনি মনোযোগী হলেন আমাদের দিকে। লাইনে তখনও ৭/৮ জন রোগী। বললাম- আমরা ব্যস্ত নই, আপনি রোগী দেখেন তারপর কথা বলি। তিনি রোগী দেখা শেষ করলেন। বললাম- হাসপাতালে এত ডাক্তার এখন পোস্টিং আপনার এখানে এত ভিড় কেন? বললেল- সরকারি চাকরি জীবনের শুরুটা হয়েছিল এখানেই। তাই অনেকেরই সাথে ব্যক্তিগত চেনা জানা। সে কারণেই বেশি মানুষ ছুটে আসেন। নতুন ডাক্তাররা আবার অনেকেই আন্তরিকও নয়। এজন্যও তাদের প্রতি আগ্রহও কম।
এবার আমার মূল আলোচনার বিষয়ে ফিরতেই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন- চলেন দেখে আসি। উনার সঙ্গে বের হলাম। ঘুরে দেখলাম পুরো হাসপাতাল কমপ্লেক্স। চলার মাঝে মাঝে বললেন বদলে দেবার গল্প। তিনি জানালেন, এর আগে যে সব পরিবর্তনের কথা লিখেছি, এর জন্য আসলে স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো বরাদ্দ নেই। তিনি এখানে এই পদে যোগদানের পর উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সেক্টর থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে অনুদান সংগ্রহ করে এসব করেছেন। আপনার পূর্বসূরীরা তো উদ্যোগী হননি। আপনার কেন মনে হল এসব করা দরকার? বললেন- সরকারি চাকরি জীবন শুরু করেছিলাম এই হাসপাতালেই। সেখান থেকেই এখানকার মানুষের সঙ্গে হৃদ্যতা। এখানকার সাধারণ মানুষ খুবই আন্তরিক। তবে নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতনতা কম।
আগের পোস্টিংয়ের সময়ই হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা ও সে ব্যাপারে উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয় নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু তখন তো কোনো ক্ষমতা ছিল না আমার হাতে। তাই এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত হবার পরই একটা পরিকল্পনা নেই একটা কিছু করার। স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে একটা মানুষ যাতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ পায় চেষ্টা করেছি সেটা নিশ্চিত করতে। এরপর আস্তে আস্তে ফান্ড সংগ্রহ করেছি আর নিজের মত করে কিছু করার চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটা করতে পেরেছি!
বললাম- অনেকটা করেছেন। এই অবহেলিত জনপদের মানুষের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তার এই আন্তরিকতা আমাদের অনেক প্রাপ্তি। হয়ত অনেকই এসব চোখে দেখবে না। কিন্তু একজন অবশ্যই দেখবেন, সেই দেখাটাই মানব জীবনের সেরা প্রাপ্তি।
কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে খাবার টেবিলে হাসপাতালের বদলে যাবার গল্প বলছিলাম। মা বললেন- ডা. মকছেদুল মোমিন আমার নিয়মিত ডাক্তার। পরিবারের অন্য সদস্যরাও চিকিৎসা নেন উনার কাছেই। খুবই আন্তরিক মানুষ। মন দিয়ে অনেকক্ষণ রোগের কথা শোনেন। সবাই তার চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। মায়ের এই সার্টিফিকেটের পর ইচ্ছে হলো একজন ভালো মানুষকে নিয়ে কিছু লিখতে। তাই এই প্যাঁচালি।
ডা. মকছেদুল মোমিনদের এসব দেশপ্রেমের কথা হয়ত আমাদের সবার চোখে পড়ে না। মানুষের নেতিবাচক দিকটাই আমরা এখন বড় করে দেখতে অভ্যস্ত। স্বাভাবিক কারণেই কাজের মূল্যায়নটা হয়ত কম। তবে যারা এসব করেন, তারা মূল্যায়িত হবার জন্য করেন না। করেন দেশপ্রেম থেকে। তবে মূল্যায়ন হলে নতুনদের কাজের আগ্রহ বাড়ে।
যখন ডা. মকছেদুল মোমিনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তখন আমাদের উপজেলা ছিল করোনামুক্ত। গতকালই একজনের আক্রান্তের খবর এসেছে। প্রথম আঘাতটাও এসেছে স্বাস্থ্য বিভাগের উপরেই। এ খবরের সাথে বেড়েছে সারাধণ মানুষের উদ্বেগ। সংগত কারণেই উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বেড়েছে দায়িত্ব। উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের জন্য অল্পকিছু স্বাস্থ্যকর্মী আর অপ্রতুল চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে হয়ত মাঠে নামতে হচ্ছে ডা. মকছেদুল মোমিনকে। এই সময়ে এই যুদ্ধে জয়ী হতে মহম্মদপুর উপজেলার মানুষকে তার পাশে থাকতে হবে। বাড়াতে হবে সচেতনতা। একজন দেশপ্রেমিক মানুষের নেতৃত্বে এ যুদ্ধ জয় করবে মহম্মদপুর উপজেলাবাসী এটাই এখন প্রত্যাশা।
পরিশেষে প্রাচীন রোমান কবি ভার্জিল এর ভাষায় বলি, ‘সে-ই সবচেয়ে সুখী, যে নিজের দেশকে স্বর্গের মতো ভালোবাসে। আপনার মধ্যে দেশকে ভালোবাসার সে নমুনা দেখেছি। আপনি ভালো থাকুন ডা. মকছেদুল মোমিন।
লেখক: বাংলাদেশ করেসপনডেন্ট, ইন্ডিয়া টুডে
 
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

stay home stay safe
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop