মুক্তকথা কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত কি সম্ভব?

০৯-০৫-২০২০, ১১:২২

ড. প্রণব কুমার পান্ডে

fb tw
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত কি সম্ভব?
কোভিড-১৯ এখন বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করেছে। যত দিন যাচ্ছে এর সর্বনাশের পরিমাণ বাড়ছে। চীনে শুরু হওয়ার পর থেকে এটি ২১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। চীন সরকার কয়েক মাসের মধ্যে কোভিড-১৯ এর বিপর্যয়কর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলেও বর্তমানে এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলো। কোভিড-১৯ এর ধ্বংসযজ্ঞ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও শুরু হয়েছে।
তবে গত দেড় মাসে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের সরকারই আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা কমাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার পরেও প্রতিদিনের রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের দিনের সংখ্যাকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার সমস্ত সরকারের জন্য এটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ সরকার কোভিড-১৯ এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, কোভিড-১৯ এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। কোভিড-১৯ এর তীব্রতা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কমানো না গেলে সার্বিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার পরেও এমন কোনও ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি যার মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর বিস্তার বা সংক্রামণ রোধ করা সম্ভব। ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা মেনে চলার মাধ্যমেই শুধু এই মরণঘাতি ভাইরাসের আক্রমণ খেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোঃ বাংলাদেশের মতো দেশে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা কি সত্যিই সম্ভব? প্রকৃতপক্ষে, জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব এবং দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মানুষকে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে বাসায় বসিয়ে রাখা সরকারের পক্ষে সত্যিই কঠিন একটি কাজ। ফলে, বিপুল সংখ্যক খেটে খাওয়া মানুষের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কোভিড-১৯ এর সংক্রামণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসাবে, সরকার সমস্ত গণপরিবহন ও অফিস আগামী ১৬ মে পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এই অঘোষিত লকডাউনের সময়সীমা কতদিন বহাল থাকবে সেই সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা এখন খুবই কঠিন। ফলে, জনগণকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে শেখ হাসিনার উপযুক্ত নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার প্রতিটি নাগরিক যাতে লকডাউনের সময় উপযুক্ত সহায়তা পায় তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা পালিয়ে যাচ্ছে। একজন দরিদ্র ব্যক্তিও যেন সরকারের সহায়তা থেকে বাদ না যায়; সেটি নিশ্চিত করার জন্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। সাধারণ মানুষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছে যে বাংলাদেশের মানুষ এখনও কোভিড-১৯ এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব কি তা অনুধাবন করতে পারছে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর সহায়তায় প্রশাসন কমিউনিটিতে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষে জনগণের ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছে। আমরা সকলেই জানি যে বাংলাদেশ কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের ৪র্থ ধাপে প্রবেশ করেছে। সুতরাং, আমাদের সবার জন্য আসল চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে কমিউনিটিতে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা।
কোভিড-১৯ বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে দেশব্যাপী জনসমাগম একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা রাস্তায় লোকজনকে নির্দ্বিধায় চলাফেরা করতে দেখছি। অনেকে আবার চা স্টলে এসে গল্পে মেতে উঠছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখন তাদেরকে জিজ্ঞাস করছে উত্তরে আনেকেই বলছেন যে দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকতে তাদের ভালো লাগছে না। এবং এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ বেশিদিন বাড়িতে থাকতে বিরক্ত বোধ করছেন। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক কোভিড-১৯ এর বিধ্বংসী প্রভাব নিয়ে বিস্তর প্রচারণা সত্ত্বেও জনগণ যে এই ধরনের আচরণ করতে পারে সেটি উপলব্ধি করতে আমার কণ্ঠ হচ্ছে।
গত চার মাস ধরে আমরা বিশ্বের অনেক পরাশক্তিকে কোভিড-১৯ এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে দেখেছি। চিকিৎসা সুবিধা উন্নত হওয়া স্বত্বেও তারা তাদের নাগরিকদের মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এমনকি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক হাজার নাগরিক মারা গেছে এবং আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়েছে। ফলে, উন্নত দেশের পরিস্থিতি যদি এমন হয় তবে বাংলাদেশের মতো দেশে কী হতে চলেছে তা উপলব্ধি করা খুব কঠিন কাজ নয়।
প্রাসঙ্গিক ভাবে একটি প্রশ্ন আমাদের সকলকে ভাবাচ্ছে।
আর এই প্রশ্নটি হলোঃ আমাদের দেশে কী ঘটতে চলেছে এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য আমরা কীভাবে মানুষকে ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে পারি? এখানে উল্লেখ্য যে, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার কিছু কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি যে, আমাদের সমাজে এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা অকারণে বাসা থেকে বেরিয়ে ঘুরাঘুরি করছে। তবে, একই সঙ্গে আমাদের সমাজের একটি বড় অংশের মানুষ জীবিকার সন্ধানে বাড়ির বাইরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। ইতিমধ্যে গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেওয়ার ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে। তাছাড়া, সকল প্রকার মার্কেট খোলার ঘোষণার সঙ্গে মানুষের বাইরে চলাফেরার প্রবণতা বেড়ে গেছে। ফলে, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা এখন মুখ্য বিষয়।
সমাজে আরও একটি শ্রেণি রয়েছে যারা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তাদের সংখ্যা পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি। তারা মূলত দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশা চালক, গৃহকর্মীসহ অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত। তারা বর্তমানে সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণি। তারা যদি সরকারের সহায়তা না পায় রাস্তায় নামবে এটিই স্বাভাবিক। এ সমস্যার ভিন্ন একটি মাত্রাও রয়েছে কারণ এই মানুষগুলোর বেশিরভাগই শহুরের বস্তিতে বাস করে। খুব সম্প্রতি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ এস্থার ডুফলো এবং অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে তাদের একটি লেখায় পরামর্শ দিয়েছিলেন যে একটি শক্তিশালী অর্থনেতিক সাহায্যই কেবল ভারতে লকডাউনকে সফল করতে পারে। তারা একথাও বলেছেন যে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ যদি শহুরের বস্তিগুলোতে প্রবেশ করে সরকারে পক্ষে এটি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে কারণ বস্তিবাসীরা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ স্যানিটেশন সুবিধা ছাড়া বাস করে।
সুতরাং, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা একটি কঠিন কাজ। আমাদের দেশের বড় বড় শহরে কয়েক লক্ষ বস্তিবাসী বাস করে। এই গোষ্ঠীগুলো ছাড়াও, আমাদের সমাজে আরও একটি বিশাল শ্রেণি রয়েছে যারা দিন মজুর। সুতরাং, সরকারী সহায়তার সুষ্ঠু ও উপযুক্ত বিতরণের মাধ্যমেই এই মানুষদের সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।
কোভিড-১৯-এর বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এই প্যাকেজের মধ্যে রফতানিমুখী শিল্পসহ কৃষির জন্য একটি বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, কোভিড -১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বরাদ্দের পাশাপাশি সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাভুক্ত সুবিধাগুলো আগামী ছয় মাস অব্যাহত রাখার এবং উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। অতি দরিদ্র জণগেষ্ঠীর দোরগোড়ায় কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছে দেবার জন্য দুস্থ মানুষের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকার অভাবী মানুষদের কাছে সরাসরি নগদ অর্থ সাহায্য স্থানান্তরের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। যদি এই উদ্যোগগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তবে আমরা এই দরিদ্র মানুষদের ঘরে রেখে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতো পারবো। তবেই, কোভিড-১৯ এর বিস্তার কমতে শুরু করবে।
একই সঙ্গে, এই সহায়তা বিতরণ প্রক্রিয়ার সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করতে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। এরই মধ্যে আমরা বেশ কিছু অনিয়মের ঘটনা দেখতে পেয়েছি যেখানে জনপ্রতিনিধিদের ত্রাণ সামগ্রী চুরি করতে দেখা গেছে। তবে, এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা খুব বেশী না হলেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এরইমধ্যে সরকার বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সময়ে, আমরা অনেক জনপ্রতিনিধিদের দেখেছি যারা ত্রাণের সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করতে দিনরাত কাজ করে চলেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, অভাবী লোকেরা যদি যথাযথ সহায়তা না পায় তবে সামাজিক দূরত্বের কথা মাথায় রেখে তারা ঘরে বসে থাকবে না।
সরকারী সহায়তার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথ কারণ ছাড়াই যারা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শক্তি প্রয়োগ ছাড়া এই ধরনের মানুষদের ঘরে রাখা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে অনেক সংস্থা মানবাধিকারের নামে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির পদক্ষেপের সমালোচনা করতে পারে। তবে, এই সমালোচনাগুলোকে আমলে নেওয়ার একটি উপযুক্ত সময় নয়। কারণ, এই বেপরোয়া মানুষদের দেশের বেশিরভাগ নাগরিককে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার কোনও অধিকার নেই। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক দূরত্বের কঠিন বাস্তবতা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এবং কোভিড-১৯ মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অন্যথায়, একটি অনিশ্চিত ভয়াবহ ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
লেখক: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

stay home stay safe
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop