মুক্তকথা প্রান্তিক মানুষের স্বপ্নে আগামীর দিনগুলি

২৬-০৪-২০২০, ১২:২৭

সুজন হাজং

fb tw
সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ একটি ভাষাগত, জাতিগত এবং সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্যের দেশ। এদেশে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়াও প্রায় ৪৫ টির অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশে আদিবাসী মানুষের সংখ্যা ৪০ লক্ষাধিক। যারা অধিকাংশই দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ। সমতল এবং পাহাড়ে বসবাসরত আদিবাসীরা আজ তাদের মাথার উপর এক টুকরো আকাশ দেখে স্বপ্ন দেখে কখন ভোর হবে ।
প্রকৃতির নিয়মে ধরিত্রীর বুকে প্রতিদিন ভোর হয়। আতঙ্কে কর্মহীন মানুষের জীবন। বাড়ছে হতাশা। সারাদেশ ঝুঁকিতে। পরিবার নিয়ে কষ্টে আছে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী  মানুষ। লক ডাউন চলছে। বাইরে যাওয়ার পথ নেই। জীবিকা নেই। স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। এই অবস্থায় কেমন আছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা? 
খাদ্য সংকটে পড়েছে আদিবাসী জনপদের শতশত গ্রাম। দিন এনে দিন খাওয়া হাজার হাজার মানুষ খাদ্যের অভাবে দিশেহারা। আদিবাসী গ্রামগুলোতে জরুরী খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন। সরকারী ত্রাণ কর্মহীন প্রান্তিক মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়ও দুঃস্থদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিতে হবে। 
বৃহত্তর ময়মনসিংহে হাজং, গারো, কোচ, বানাই, ঢালু, হদি, বর্মণ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা হতাশা এবং অর্থনৈতিক সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভালো নেই আদিবাসী গ্রামগুলো। বৃহত্তর ময়মনসিংহে ১০৪ টি হাজং গ্রামে খাদ্য সংকট দিন দিন বেড়ে চলছে। 
একসময় কৃষির উপর নির্ভরশীল হাজংরা আজ ভূমিহীন। কেউ কেউ অন্যের জমি বর্গা করে কোনরকম জীবিকা নির্বাহ করে। আবার কেউ কেউ অন্যের জমিতে দিন মজুর হিসেবে কাজ করে। ঘরে খাবার মজুদ নেই। তারা কিভাবে চলবে সামনের দিনগুলোতে? 
বানাই, হদি এবং ঢালুদের নিবর হাহাকার কেউ শুনতে পাচ্ছে না। ঘরে খাবার না থাকা নিম্নআয়ের আদিবাসী মানুষেরা যে নিরবে মুখ লুকিয়ে কান্না করছে সেই কান্নার শব্দ আমরা কি শুনতে পাই? এই রাষ্ট্র কি শুনতে পাই? সমাজের বিত্তবানরা কি শুনতে পাই? 
একসময় এই অঞ্চলে হাজং এবং গারোরা অগাধ ভূসম্পত্তির মালিক ছিল। আজ তারা নিজভূমে পরবাসী। মাঠভরা ফসল, গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ এটি যেন আজ তাদের জীবনে রূপকথার গল্পের মতো! 
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আদিবাসী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চংগ্যা, ম্রো, লুসাই, বোম, পাংখো, খুমি, চাক, খেয়াং জনগোষ্ঠীর মানুষেরা আতঙ্কে আছে। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে জীবনের সাথে। এই যুদ্ধ করোনামুক্ত বেঁচে থাকার যুদ্ধ। আবার সেখানকার কর্মহীন গৃহবন্দি মানুষের কাছে এই যুদ্ধ প্রতিদিন খাবার সংগ্রহের যুদ্ধ। টিকে থাকার যুদ্ধ। তাদের শিশুদের জন্য দুবেলা পেটপুরে খাবার ব্যবস্থা করার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তারা কতদিন টিকে থাকবে কেউ জানে না।
উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতো, মুন্ডা, মালো, পাহান, সিং, মাহালি পাহাড়িয়াসহ ১৫ লক্ষ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা কঠিন সময় পার করছে। তারা তো স্বপ্ন দেখাই ভুলে গেছে। ভূমি রক্ষার লড়াই থেকে শুরু করে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তারা এখন জীবনের শেষ ধাপে। চরম দারিদ্র্য সীমায় থেকে এখন তারা করোনা বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ। ঘরে বসে খাদ্যহীন করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা কখনো জয়ী হবে না। তাদেরও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হবে। তাদেরও হারাতে হবে প্রিয়জনকে।
ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিউটি পার্লারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। রাজধানীর পারসোনা, ফারজানা শাকিলস থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা শহরের অনেক বিউটি পার্লারগুলোতে হাজার হাজার আদিবাসী নারী কাজ করতো। এদের মধ্যে অধিকাংশই মাতৃতান্ত্রিক গারো সম্প্রদায়ের। অর্থ অভাবে পড়াশোনা করতে না পারা মেয়েরাই এসব বিউটি পার্লারগুলোতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তাদের উপার্জিত টাকায় অনেক পরিবার তাদের সংসার চালাতো। কেউ কেউ গ্রামে ভাইবোনদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতো। আবার কেউ তার অসুস্থ বাবা মায়ের ঔষধ কেনার জন্য টাকা পাঠাতো। এরকম অনেক উদাহরণ আছে যে পার্লারে চাকুরী করা বোনের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ছে ভাই। 
সৌন্দর্যপ্রিয় এই আদিবাসী তরুণীরা কর্মবিমুখ নয় বরং আজ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এরকম  প্রতিকূল পরিবেশে তারা কতদিন টিকে থাকবে। আর কতদিন লাগবে সবকিছু স্বাভাবিক হতে? আবার কবে তারা কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবে? কোন উত্তর জানা নেই তাদের। রাত যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। প্রতিনিয়ত করোনা আক্রান্তের ভয় যেন পিছু ছাড়ছে না। তাদের স্বপ্নহীন বেঁচে থাকার পথ যেন আরো দীর্ঘ হচ্ছে।
বরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের উপন্যাস কাঠ কয়লার ছবি'র মতো সিলেটে চা শ্রমিকদের জীবন। তাদের জীবন যেন একটি লস্ট আইডেনটিটির গল্প। যেখানে চা শ্রমিকদের শোষণ ও বঞ্চনার কথা লেখা আছে। এই নৃতাত্ত্বিক জাতিগত পরিচয়হীন চা শ্রমিকরা এখনো বঞ্চনার শিকার। 
সম্প্রতি মজুরির দাবিতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় কালিটি চা বাগানে চা শ্রমিকরা ভূখা মিছিল ও বিক্ষোভ করেছে। ১৫৩ টি চা বাগানে কর্মরত দশ লক্ষাধিক চা শ্রমিকদের জীবন দুর্বিষহ। খাবারের অভাবে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটছে তাদের। সারাদিন কাজের পর একজন চা শ্রমিক মজুরি পান মাত্র ১০২ টাকা। সাপ্তাহিক ছুটি রোববার ছাড়া তাদের প্রতিদিনই কাজ করতে হয় বিভিন্ন বাগানে। করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি যেন তাদের জীবনে নেই! তাদের জীবনের যেন কোন মূল্য নেই! তারা যেন ক্রীতদাস। 
বনের ভেতর স্বপ্ন খোঁজা, চায়ের পাতায় জড়িয়ে মমতা খোঁজা, ক্লান্তি শেষে গাছের শীতল ছায়ায় প্রাণ জুড়িয়ে নেয়া, ভূমিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাওয়া, প্রকৃতিকে ভালবেসে মরতে চাওয়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা আজ হুমকির মধ্যে। এই হুমকি অর্থনৈতিক। এই হুমকি চরম খাদ্য সংকটের। পাহাড় আর সমতলের কর্মহীন মানুষদের নেই কোন উপার্জন। শিশুদের মুখে তাকালে দেখা যায় পুষ্টিহীনতার ছাপ। কঠোর পরিশ্রমী আদিবাসী নারীরা এখন ঘরমুখী। অসহায় কর্মহীন। 
করোনা যেন এক প্রকৃতির প্রতিশোধ। অবিরাম আক্রান্ত হচ্ছে শহর থেকে শহর। গ্রাম থেকে গ্রাম। ধনী থেকে গরীব। ডাক্তার থেকে নার্স। গার্মেন্ট মালিক থেকে শ্রমিক। শিল্পী, সাহিত্যিক,আমলা, সাংবাদিক, পুলিশ, মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। আজ মানুষ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এটা যেন এক প্রকৃতির বঞ্চনা। হয়তো বা অভিপাশ। 
প্রান্তিক মানুষের স্বপ্নে আগামীর দিনগুলি অনিশ্চিত এবং গন্তব্যহীন ...
তারপরও আমরা স্বপ্ন দেখি - আবার আলোর পথে মিছিল হবে, দূর হবে এই অন্ধকার। আবার প্রিয়জনের হাতে হাত রেখে ভালবাসা হবে একাকার। আবার নতুন ভোরের সূর্যোদয় হবে পৃথিবীতে। আবার পাহাড়ের বুকে আত্মবিশ্বাসী মানুষেরা জেগে উঠবে পাখির কলকাকলিতে। 
লেখক: সুজন হাজং,গীতিকার
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

stay home stay safe
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop