মুক্তকথা করোনা মোকাবিলা: সফলদের সাফল্যগাঁথা বনাম বাংলাদেশের প্রস্তুতি

১৫-০৪-২০২০, ১১:১৮

ওয়েব ডেস্ক

fb tw
করোনা মোকাবিলা: সফলদের সাফল্যগাঁথা বনাম বাংলাদেশের প্রস্তুতি
বিশ্বের দেশে দেশে মহামারী আকার ধারণ করছে করোনাভাইরাস। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। বাড়ছে আতঙ্ক, ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতা। এমনকি করোনার হানায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশেও দিনে দিনে সংক্রমণের হার খুব দ্রুত বেড়ে চলছে। এখনই সংক্রমনের হার নিয়ন্ত্রনে রাখতে না পারলে অর্থনীতিতে মন্দাভাব আরও প্রকট হবে নিঃসন্দেহে। করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রনে সফল দেশগুলোর সাফল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রায় সবগুলো ক্ষেত্রেই আমাদের প্রস্তুতি দুর্বল এবং অনেকাংশেই পিছিয়ে আছে যা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে অথবা ব্যাপারটা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে যেমনটা হয়েছে ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও আমেরিকার ক্ষেত্রে। যে যে কারণে তারা সফল সেগুলো বিশ্লেষনযোগ্যঃ
১. সফল প্রতিটি দেশ করোনাভাইরাস আক্রমণের পূর্বেই গুরুত্বের সহিত দ্রুত প্রস্তুতিমূলক সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যেমন- ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা গ্রহণ, আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টাইন ইউনিট প্রস্তুতকরণ, আক্রান্ত ব্যক্তিদের আলাদা করা এবং সামাজিক মেলামেশাকে নিরুৎসাহিত করা। পদক্ষেপগুলো তারা অতি দ্রুততার সাথে নিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত তা নেয়নি। ফলে আজ তাদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বর্তমানে আমেরিকায় করোনা আক্রান্তদের প্রায় ৯০ ভাগ চিকিৎসা সেবার জন্য হাসপাতালে জায়গা পাচ্ছে না। কারণ, আক্রান্তের সংখ্যা এত বেশি যে বিদ্যমান চিকিৎসক ও নার্স সংখ্যা এবং স্বাস্থ্যসেবা ফ্যাসিলিটিজ অপ্রতুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে পর্যাপ্ত লোকবল ও কফিন পাওয়া যাচ্ছে না।
২. করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি সনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে ওই অঞ্চলকে লকডাউন করেছে এবং সকলকে কড়া নজরদারিতে রেখেছে যাতে সংক্রমণ অন্যদের মাঝে ছড়াতে না পারে। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে তারা খুবই কঠোর অবস্থানে ছিল। কোন অবস্থাতেই কেউ ঘরের বাইরে যেতে পারেনি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো দেশও লকডাউন করেছে।
৩. জনগণকে ভালোভাবে বিষয়টি অবহিত করতে এবং নাগরিক সচেতনতা তৈরিতে প্রেরণামূলক ছবি, বিজ্ঞাপন তৈরি সহ টিভি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানোর কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে। জনগণ সচেতন না হলে এবং লকডাউন মেনে চলতে সহযোগিতা না করলে, সরকারের একার পক্ষে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সফল করা সম্ভব নয়। সফল দেশগুলোর জনগণ সর্বদা সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে।
৪. কোনো ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিনা সে পরীক্ষা বিনামূল্যে ব্যাপকভাবে করেছে। কোন কোন অঞ্চলের উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন সকলকে পরীক্ষা করেছে। বাংলাদেশ অবশ্য ইতিমধ্যে বিনামূল্যে পরীক্ষা করানোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
৫. অতি দ্রুত উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিদের পরীক্ষা করে আক্রান্ত ব্যক্তি সনাক্ত করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, গোয়েন্দা তথ্য এবং অ্যাপসের মাধ্যমে ট্রাকিং করে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে কারা কারা এসেছে তাদের সনাক্ত করে পরীক্ষা করা হয় এবং তাদের আইসোলেশনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয় যতক্ষণ না পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হয়।
৬. করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে সামাজিক মেলামেশা বন্ধ রেখে দূরত্ব বজায় রাখা অন্যতম কার্যকর একটি উপায় ছিল। কোন বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে শুধুমাত্র সবুজ সিগন্যালযুক্ত বা সুস্থ ব্যক্তি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার শর্তে বাইরে বের হতে পেরেছে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে বেশ ঘাটতি রয়েছে। এখনো ব্যাপকভাবে করোনা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা যায়নি এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সঠিকভাবে সনাক্ত করা গেলেও তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে আটকে রাখা যাচ্ছে না। আজ পর্যন্ত করোনাভাইরাস বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলায় যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে প্রতিটি জেলায় ব্যাপকভাবে করোনা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা অতিব জরুরী। বাংলাদেশের শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত সকলের মধ্যেই সচেতনতা ব্যাপক ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই জনগণ সর্বত্র সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে না। এমনকি লকডাউন অঞ্চলেও অনেককে অকারণে বাইরে বের হতে দেখা যায়। যদিও এ মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ লকডাউন অঞ্চল ঘোষিত হলেও সেখান থেকে মানুষ রাতের অন্ধকারে ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে যাচ্ছে যা বর্তমানে করোনা সংক্রমণে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ধাপে (প্রথম ধাপ: শুধুমাত্র সংক্রমিত ব্যক্তি; দ্বিতীয় ধাপ: গোষ্ঠী সংক্রমণ অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার ও তার আত্মীয় -স্বজন; তৃতীয় ধাপ: কমিউনিটি সংক্রমণ; চতুর্থ ধাপ: এপিডেমিক অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও কমিউনিটি সংক্রমণ যেখানে সংক্রমণের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না ও অতি দ্রুত জ্যামিতিক হারে সংক্রমণ হয়) চলে এসেছে। এ অবস্থায় কঠোর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়াটা খুবই জরুরী। অন্যথায় বাংলাদেশ খুব দ্রুত করোনা সংক্রমনের চতুর্থ ধাপে প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে যা দেশের জন্য আশঙ্কাজনক।
জরুরি পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে পরামর্শ দেয়ার জন্য গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সভাপতি ড. ডেভিড এল হিম্যান বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও সহকর্মীদের মাধ্যমে গুচ্ছাকারে ভাইরাসটি সংক্রমিত হয়। করোনা মোকাবেলায় করণীয় নিয়ে একাধিক মার্কিন বিশেষজ্ঞ তাদের মতামত দিয়েছেন। তারা বলেছেন, জনগণকে অবশ্যই বাড়িতে থাকতে হবে। এর পাশাপাশি এমন সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে, যাতে সংক্রমণের শিকার হওয়া ব্যক্তিকে আলাদা রাখা যায় এবং বাড়ির বাইরে থেকে যত্ন নেয়া যায়। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াতে হবে। মাস্ক ও ভেন্টিলেটর উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ- প্রথমত, এমন পরিস্থিতিতে রাজনীতিবিদদের সরে দাঁড়াতে হবে এবং বিজ্ঞানী ও গবেষকদের কথা অবশ্যই শুনতে হবে ও তদনুযায়ী এগোতে হবে। যুদ্ধের সময় যেমন জেনারেলরা প্রতিদিন ব্রিফিং করেন, তেমনি এমন মহামারী বিষয় জটিল ধারণা ব্যাখ্যা, ওষুধ বা সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার পরামর্শে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুই সপ্তাহের মধ্যে কোন ভাইরাসের সংক্রমণের উপসর্গ দেখা যায়। কাজেই, যদি যথেষ্ট পরীক্ষা করা যায় এবং সংক্রমিত সবাইকে আলাদা ও তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ১৪ দিন পর্যন্ত এক জায়গায় আটকে রাখা যায়; সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যায় তবে ভাইরাস সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। ভাইরাস যেভাবে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে তাতে শুধুমাত্র সংক্রমিত অঞ্চল লকডাউন করে আশানুরূপ ফল পাওয়া কঠিন হবে। এ অবস্থায় ১৪ দিনের জন্য পুরো দেশ লকডাউন করা অতি জরুরী। যেহেতু বাঙালি জাতি হিসেবে অতি আবেগপ্রবণ ও আড্ডাবাজ, সেহেতু লকডাউন বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগে অতি নিষ্ঠুর হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে লকডাউন, কারফিউ ও জরুরি অবস্থা জারির মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের গতি কিছুটা থেমেছে। তবে এখনও প্রকোপ ছড়ানোর আশঙ্কা কমেনি। তাই এখনই মানুষকে ঘরে রাখার কঠোর ব্যবস্থা শিথিল করা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিস্টিনা লুদ্যমেয়ার এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো- এখনই কঠোর পদক্ষেপ থেকে সরে আসা যাবে না। এটা অনেকটা সুস্থ হওয়ার আগেই বিছানা ছেড়ে উঠে যাওয়ার মতো। আপনি যদি এ কাজ করেন, তবে আবার অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
লেখক: লিটন চন্দ্র সেন, সহযোগী অধ্যাপক, কমিউনিটি হেলথ এন্ড হাইজিন বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

stay home stay safe
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop