মুক্তকথা এই ক্যাডারও সেই ক্যাডার; তবে মার্কিনি নন, বাংলাদেশি

৩১-০৩-২০২০, ১৮:৪৭

পলাশ মাহমুদ

fb tw
এই ক্যাডারও সেই ক্যাডার; তবে মার্কিনি নন, বাংলাদেশি
করোনায় সংক্রমিতদের সেবা দেয়ার জন্য হটলাইন চালু করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। বিশ্বব্যাপী এ ক্রান্তিকালে দেশে অসুস্থ বা জরুরি সেবা পাওয়ার জন্য এ নম্বরগুলোতে ফোন দেয়ার কথা। কিন্তু গণমাধ্যমে দেখলাম, ওই নম্বরগুলোতে বহু মানুষ ফোন করে ফোন রিসিভকারী বোনদের বিকৃত কথা বলছেন। বিকৃত বলতে কী তা নিশ্চই আর বলার দরকার নেই।
দেশজুড়ে বর্তমানে চলাচল সীমিত। ফলে যেসব শ্রমজীবী মানুষ ঘরের বাইরে যেতে পারছেন না বা কাজ করতে পারছেন না তাদের খাদ্য বা নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সহায়তা করতে সরকারের পাশাপাশি নানা স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপ কাজ করছে। ‘করোনায় স্বেচ্ছাসেবী’ নামের গ্রুপে এক তরুণী সদস্য হওয়ার জন্য নিজের তথ্য পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তার ফোন নম্বরও ছিল। কিছুক্ষণের মধ্য মেয়েটি আমাকে জানাল, তার ফোনে একজন কল দিয়ে আপত্তিকর কথা বলেছে। এই ‘বহু মানুষ’ বা ‘একজন’ কারা? প্রথমে সবার কাছে এ প্রশ্নটি রাখছি।
করোনায় বিপর্যস্ত নিউইয়র্ক থেকে মাহফুজুর রহমান রুবেল নামের এক প্রবাসী সামাজিকমাধ্যমে লাইভে একটি হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি কথা বলতে গিয়ে কেঁদেও ফেলেছেন। করোনায় সংক্রমিত একজন ডাক্তার রুবেল সাহেবের শিশু সন্তানকে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে চিকিৎসা দিয়েছেন। চিকিৎসা দেয়ার সময় ওই ডাক্তার বারবার কাশছিলেন। নিজে মৃত্যুর মুখে থেকেও অন্যকে সুস্থ করার লড়াই করছেন তিনি। ঘটনাটি নিশ্চই হৃদয়স্পর্শী। এমন মানবিক ডাক্তার খুব কমই হয়। রুবেল সাহেব বাংলাদেশের মানুষকে ওই ডাক্তারের থেকে মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শেখার পরামর্শ দিয়েছেন। ওই ডাক্তারের মানবিকতা ও দায়িত্ববোধকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই।
এবার এসিল্যান্ড সায়মাকে তুলোধুনা করি। তিনি কয়েকজন বাবার বয়সী ব্যক্তিকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অপমানিত করেছেন। আমরা ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছি। সায়মা অবশ্যই ভুল করেছেন। এ কাজের জন্য সামাজিকভাবে তাকে যে হেয়প্রতিপন্ন হতে হয়েছে তা যদি তিনি আগে বুঝতে পারতেন তাহলে কোনোভাবেই এটি করতেন বলে মনে হয় না। তার এ ঘটনা পুরো প্রশাসন ক্যাডারের সম্মানে আঘাত হেনেছে। অনেকে সায়মার সঙ্গে বিবিএস ক্যাডারদের, প্রশাসন ক্যাডারদের তুলোধুনা করেছেন। গণরোষে এমনটি হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু সায়মা, নিউইয়র্কের ডাক্তার আর ফোন কলের এ এক একটি ঘটনাই সমাজের বা দেশের পূর্ণ চিত্র নয়। তবে সায়মার ক্ষেত্রে যে পাবলিক রিঅ্যাকশন হয়েছে সেটা একটি রিঅ্যাকশন নয়, হাজার হাজার। সুতারাং গবেষণার সূত্রে পপুলেশন দেখলে আমরা এটাকে সামাজিক রিঅ্যাকশনের মোটামুটি একটি চিত্র বলতে পারি। এর উল্টো একটি চিত্র উল্লেখ করব কিছুক্ষণ পর।
সায়মার ঘটনা নিয়ে আমরা যে চিত্র দেখিয়েছি তাতে পুরো প্রশাসন ক্যাডারকে অপদস্ত হতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, সন্তান অপরাধ করলে পিতাকে বা মাতাকে শাস্তি দেয়া যায় না। ভাই অপরাধ করলে অন্য ভাই বা বোনকে শাস্তি দেয়ার সুযোগ নেই। শাস্তি শুধু আদালত থেকে হয় এমন ধারণাও সঠিক নয়। সামাজিকভাবে সায়মা যে শাস্তি পেয়েছেন তা আদালতের শাস্তির চেয়ে ঢের বেশি। কিন্তু আমরা সায়মার সঙ্গে প্রশাসন ক্যাডার পরিবারের বাবা-মা, ভাই-বোন সবাইকে বেদম প্রহার করলাম।
আমাদের প্রহারের তালিকায় এমন সব মানুষরা রয়েছেন তারা ওই মার্কিনি ডাক্তারের চেয়ে কম নন। দু’একটি উদারণ দেয়া যাক। করোনায় এখন আমাদের ঘর থেকে বের হতে মানা। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি দায় সারা দায়িত্ব পালন করেন আর নিজের সুরক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তাহলে তার চাকরি, পেনশন বা পদোন্নতির কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিটি জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) রাস্তায় মাইকিং করছেন। পুলিশ প্রশাসন লকডাউন এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। এমন দৃশ্য বহুদিন আমরা দেখি না। তারা এগুলো কার জন্য করছেন?
সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে এখন ছুটি চলছে। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মাঠে। ঢাকার কর্মকর্তারা ছাড়াও সব জেলার সহকারী পরিচালকরা দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিনই বাজার তদারকি করছেন। যেটা জানতে পারলাম, অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা (অতিরিক্ত সচিব) অফিস আদেশ দিয়েছেন, করোনার সুযোগে যেন মূল্য নৈরাজ্য না হয় সেই ব্যবস্থা করতে।
ভোক্তা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে প্রতিদিনই ঢাকার বিভিন্ন বাজারে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তার নামটি উল্লেখ করলাম এজন্য যে, এ মানুষটিও সায়মার মতো প্রশাসন ক্যাডারের একজন সদস্য। তিনিও এক সময় এসিল্যান্ড ছিলেন। বড় ব্যাপার হচ্ছে, মনজুর শাহরিয়ার ওপেন হার্ট সার্জারি করা একজন মানুষ। এ পরিস্থিতিতে বাইরে থাকা তার জীবনের জন্য ঝুকিপূর্ণ। করোনা থেকে দূরে থাকতে তার অবশ্যই ঘরে থাকা উচিত। কিন্তু তিনি বাজারে বাজারে ঘুরছেন কার জন্য? ভাবুনতো ওপেন হার্ট সার্জারি করা মানুষের জন্য এখন বাজারে বাজারে ঘোরা কতটা নিরাপদ?
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহবুব কবির মিলন (অতিরিক্ত সচিব) সায়মার বাবার বয়সী হবেন। তিনিও একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমি অনুতপ্ত, লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। আমাদের মেয়েটির ভুলের দায় আমার, আমাদের। আমরা হয়তো পারিনি, আমাদের সন্তানদের অন্তরের গভীরে ঢুকে মানবিক মূল্যবোধ জাগাতে।’ পিতা হয়ে মেয়ের জন্য তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। তাহলে আমরা কেন মেয়ের ভুলের জন্য পিতা-মাতা, ভাই-বোনকে শাস্তি দিলাম?
সায়মা ভুল করেছেন। কারণ সায়মা এ সমাজেরই একজন। সমাজে বহু ভুলের ঘটনা ঘটে। এই ফোন করা বহু মানুষ বা একজন কারা? তারাও আমরা বা এ সমাজের মানুষ। আবার সমাজে বহু ভালো ঘটনাও ঘটে। তখন সমাজের উল্টো চিত্র দেখা যায়। যে উল্টো চিত্রের কথা বলবো বলে ওপরে উল্লেখ করেছি।
গত বছর ঈদের আগে একটি বড় প্রতিষ্ঠান পাঞ্জাবির মূল্য বেশি নেয়ায় মনজুর শাহরিয়ার ওই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছিলেন। পরে তাকে বদলির আদেশ দেয়া হয়েছিল। সেই ঘটনায় আমরা ‘সমাজ’ যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলাম তা ছিল দৃষ্টান্তমূলক। মানুষের দাবির ফলে প্রধানমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিয়ে মনজুর শাহরিয়ারকে স্বপদে বহাল রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা মনজুর শাহরিয়ারকে ভালোবাসা দিয়েছিলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন বলেই কিন্তু তিনি এখন চাকরির দায়িত্ব বাইরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু সায়মার জন্য কি আমরা তাকে শাস্তি দিতে পারি? সেটি অবশ্যই উচিত নয়। যদিও আমরা সেটি করেছি। শুধু বাবলু কুমার সাহা, মাহবুব কবির মিলন বা মনজুর শাহরিয়ার নয়, বহু প্রশাসন ক্যাডার ভালো কাজ করছেন। কর্মক্ষেত্রের পার্থ্যক্যের কারণে অনেকের জনগণের সামনে আসা হয় না বলে আমরা জানি না, চিনি না।
ভালোর মধ্যে মন্দ আর মন্দের মধ্যে ভালো নিয়েই আমাদের দেশ-সমাজ। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের উন্নত মানুষের মতো মানুষ আছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু ধর্ষণের বিষয়টি যদি বলি তাহলে দেখব, যেখানে প্রতি চার জনে একজন নারী ধর্ষণের শিকার। অর্থাৎ সেখানেও ভালোর মধ্যে মন্দ আর মন্দের মধ্যে ভালো রয়েছেন। কিন্তু আমরা বরং এক দিক দিয়ে বেশি ভালো। আমরা ভালোকে ভালো বলি, মন্দকে মন্দ। সায়মাকে মন্দ বলেছি, মনজুর শাহরিয়ারকে ভালো বলেছি। সায়মার ভুলের জন্য তার পিতৃতুল্য আরেক প্রশাসন ক্যাডার ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু সায়মার জন্য সেই পিতা-মাতা, ভাই-বোনকে আমরা যে শাস্তি দিয়েছি তার জন্য আমরা ক্ষতা চাইনি। আমি মনে করি, সায়মার ভুলের জন্য সবাইকে শাস্তি দেয়াটা আমাদের ভুল হয়েছে। এজন্য আমি মাহবুব কবির মিলনের কথাটিই ফিরিয়ে দিয়ে বলছি, ‘আমি অনুতপ্ত, লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। ভুলের দায় আমার, আমাদের। আমরা হয়তো পারিনি, আমাদের সন্তানদের অন্তরের গভীরে ঢুকে মানবিক মূল্যবোধ জাগাতে।’
লেখক:
পলাশ মাহমুদ
নির্বাহী পরিচালক, কনসাস কনজুমার্স সোসাইটি (সিসিএস)
ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সময় নিউজ

করোনা ভাইরাস লাইভ

আরও সংবাদ

stay home stay safe
বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop