মুক্তকথা সংস্কৃতির শাটল যখন রাজনৈতিক দলের টর্চার সেল

০৬-০৩-২০২০, ২০:৩৯

পার্থ প্রতিম বিশ্বাস

fb tw
সংস্কৃতির শাটল যখন রাজনৈতিক দলের টর্চার সেল
‘ইস্টিশনের রেল গাড়ীটা, মাইপা চলে ঘড়ির কাটা কিংবা গাড়ী চলে না, চলে না রে গাড়ী চলে না’ বেসুরো গলায় এসব গান নিয়মিত সঙ্গী ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শাটল ট্রেনে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের। ‘ককপিট’  নামটি শুনে মনে হতে পারে এটি বিমানের কোন ককপিটের নাম। কিন্তু বাস্তবে তা নয়, এটি রেলের একটি বগির নাম। তূর্না, গোধুলী, সুবর্ণ, শোভন- বগিগুলোর এসব নাম রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দেয়া নয়। এটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি বগির নাম। যার নামকরণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই।
শাটল ট্রেনের বগির আরো বিচিত্র সব নাম রয়েছে। চবির বগিবাজ শিক্ষার্থীদের দেয়া নামগুলোর মধ্যে আছে- দোস্ত, অক্টোপাস, ফাইট ক্লাব, উল্কা, একাকার, খাইট্টা খা, এফিটাপ, সিক্সটি নাইন, বিজয়, ভার্সিটি এক্সপ্রেস, সিএফসি, অলওয়েজ। মূলত প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর হাতে যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জিম্মি ছিল তখন বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক চর্চা কিংবা প্রগতিশীল ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শাটল ট্রেনের বগির বিভিন্ন নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানান প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। সেই সময় শিবিরের বিরুদ্ধে গিয়ে শাটল ট্রেনগুলোতে সাংস্কৃতিক চর্চা করা হত। এছাড়া শিল্পের শৈল্পিক রঙে রাঙানো ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন। বিভিন্ন রঙের শাটলের বগিগুলো থেকেই উঠে আসত ছাত্র রাজনীতির নতুন মুখ।
বাইরে থেকে ঘুরতে আসা অনেকেই প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যেতেন চবির শিক্ষার্থীদের ছাত্রজীবনের অপরিহার্য অংশ এই শাটল ট্রেনগুলোর। এই ট্রেনগুলো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। চলন্ত শাটল ট্রেনের জানালার দিয়ে দেখা, যায় মানুষের বিচিত্র জীবন, অপরূপ প্রকৃতি দর্শন কিংবা রেললাইনের পাশ ঘেঁষে থাকা শুভ্র কাশফুলে হাতের স্পর্শ সবই সম্ভব শুধুমাত্র চবির শাটল ট্রেনে। অনেক শিক্ষার্থী এটিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ বলে অভিহিত করেন।
এই শাটল ট্রেন নিয়ে গান, কবিতা, নাটক উপন্যাস, টেলিফিল্ম, নাটক সব তৈরি হয়েছে। শুধু বাকি ছিল সিনেমার। অবশেষে তাও হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী প্রদীপ ঘোষ শাটল ট্রেন নিয়ে তৈরি করেছেন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর নাম দিয়েছেন ‘শাটল ট্রেন’।
শাটল ট্রেনের বগি ভিত্তিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ‘খাইট্টা খা’। ১৯৯৩ সালে শাটল ট্রেনে করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দঘন পরিবেশে যাতায়াতের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল খাইট্টা খা। প্রাক্তন এক শিক্ষার্থী জানান, দীর্ঘদিন যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের দখলে ছিল। তাদের ইশারায় চলত সব কিছু। বন্ধ ছিল প্রায় সব সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। গান, বাজনা ছিল নিষিদ্ধ। আর সাংস্কৃতিক চর্চাকে বেগবান করতে বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে যেমন খাইট্টা খা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তেমনি অন্যান্য বগিভিত্তিক সংগঠনগুলোও তাদের যাত্রা শুরু করেছিল।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসাইন টিপু নেতৃত্ব দিচ্ছেন বগিভিত্তিক সংগঠন ‘সিক্সটি নাইনের’। তিনি বলেন, “২০০৭ সালে সিক্সটি নাইনের যাত্রা শুরু। কীভাবে এই নামের প্রচলন হয়েছে সেই বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। প্রাক্তন ভাইয়েরা এর নামকরণ করেছিলেন। মূলত প্রগতিশীলতার চর্চাকে বেগবান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সিক্সটি নাইনের যাত্রা শুরু হয়েছিল।”
একটা সময় শাটলের গান শিক্ষার্থীদের যাতায়াতকে করত প্রাণবন্ত। গানের কথা, সুরে খুঁজে পাওয়া যেত দেশ ও মাটির গন্ধ। আবেগ জড়ানো সুখে ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, দেশাত্মবোধক, বাউল, নজরুল, হিন্দি, ব্যান্ড, ইংরেজি গানে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত শাটলের এক একটি বগি।
গলা ফাটিয়ে গান গেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া কিংবা বন্ধু-বান্ধব সবাই একসাথে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারে সেই জন্য এসব বগি বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিভিন্ন নামের বগি এখন আর নেই। অনেক নামও এখন বিলুপ্ত প্রায়। নতুন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন বা হবেন তারা হয়ত এই সব নামের কোনো বগিই এখন আর খুঁজে পাবে না। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হয়েছেন বা ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে যারা এসেছেন তারা নিজেদের মত করে বগিগুলোর নামকরণ করেছেন। মূলত কয়েকটি বগিভিত্তিক সংগঠন ছাড়াই বেশির ভাগ সংগঠনই এখন বিলুপ্তপ্রায়।
এখন আর যেমন রঙচঙা সেই বগি দেখা যায় না, তেমনি বগিভিত্তিক সংগঠনগুলো হারিয়েছে তাদের গৌরব। বর্তমানে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে শাটলের গানে। এখন আর আগের মত ট্রেনের বগিতে বাজনা তুলে গান করা হয় না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে ভয়ে শাটল ট্রেনে উঠতেই চান না। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিভিন্ন সময় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের মারামারির জেরে অনেকটাই আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে বগিগুলো। বগিভিত্তিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বারবার মারামারি ও সংঘাতের জেরে ২০১৫ সালে চবিতে বগিভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধ হওয়ার পর এই সব সংগঠন ক্যাম্পাসে থাকলেও শাটলের বগি এখন প্রায় বিচ্ছিন্ন।
সবশেষ গত বুধবার মধ্যরাতে ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক দুটি গ্রুপ কনকর্ড ও বিজয়ের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন। এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, এখন আর শাটলের বগিভিত্তিক সংগঠনগুলোর সেই ঐতিহ্য আর নেই। ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের স্বার্থে বগিভিত্তিক সংগঠনগুলোর নামকে ব্যবহার করা ও মারামারি, সংঘর্ষের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আর বগি ভিত্তিক কোনো কিছু নিয়ে আগ্রহ নেই বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শাটল ট্রেনগুলো আগের সেই প্রাণবন্ত চরিত্র হারিয়ে অনেকক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল-উপ দলগুলোর টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ বিষয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, আগে বগিভিত্তিক সুবিধার কারণে সবাই এক হয়ে গান করার সুবিধা পেত। বর্তমানে বগিভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ। আর সাংস্কৃতিক চর্চার বগিগুলো রাজনৈতিক রঙ দেয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন বগিগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে শাটলের যে ঐতিহ্য সেটি আবার ফিরে আসুক, এমন প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের।
চট্টগ্রাম শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের ভাঁজে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা বর্তমানে ২২ হাজারের বেশি। প্রতিদিন আট থেকে দশ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন এই শাটল ট্রেনে। শহর থেকে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে একমাত্র জনপ্রিয় মাধ্যম এই ট্রেন। মূলত বন্ধু-বান্ধবসহ এক সাথে আড্ডা দিয়ে যাওয়া আর গান করে করে যেতে পারার কারণে সকল শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় যাতায়াতের এই মাধ্যম।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে শাটল ট্রেনের যাত্রী হয়ে গলা ফাটিয়ে গান গাওয়াদের মধ্যে দেশ বরেণ্য শিল্পী হয়েছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে নকীব খান, পার্থ বড়ুয়া, আইয়ুব বাচ্চু, তপন চৌধুরী অন্যতম।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬৬ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর দিকে শাটল ট্রেন ছিল না। তখন ছাত্রছাত্রীদের নাজিরহাট লাইনের ট্রেনে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নাম্বার গেইটে নামতে হত। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রি বাসে চড়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে হত। ১৯৮০ সালে চালু করা হয় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য শাটল ট্রেন। তখন বিশ্বের মধ্যে শুধুমাত্র দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শাটল ট্রেন ছিলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যটি হল যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রানসিসকো বিশ্ববিদ্যালয়। তবে চালু হওয়ার কিছুদিন পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে শাটল ট্রেনের একমাত্র দাবিদার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনা ভাইরাস লাইভ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop