মুক্তকথা ‘স্পার্ক জেনারেশন’-এর সাহিত্য আন্দোলন এবং কর্পোরেট সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা

১৮-০২-২০২০, ২০:২৪

স্বপন দত্ত

fb tw
‘স্পার্ক জেনারেশন’-এর সাহিত্য আন্দোলন এবং কর্পোরেট সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা
বাংলাদেশ তখন সদ্য-স্বাধীন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অর্থনৈতিক ভাবে বিপর্যস্ত। মুক্তিযুদ্ধের সরকার দেশ পুনর্গঠনে আপ্রাণ নিবেদিত। চীন-মর্কিন বিরোধিতা তখনও অব্যাহত। চলছে, সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের দ্বি-জাতিতত্ত্বের এস্টাব্লিশমেন্টের কবল থেকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়ী বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানামুখী সঙ্কট তৈরির কর্মকাণ্ড। বঙ্গবন্ধু তাঁর সহযাত্রী চার যোগ্য নেতাকে নিয়ে দেশে বিদেশে সব প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করছেন আর দেশকে গড়ে তোলার শ্রম দিয়ে চলেছেন।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশের ভেতরেই ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত নোতুন দেশটির সরকারের প্রতিপক্ষ - ধর্মান্ধগোষ্ঠী, গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী পরাজিত শত্রু ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক লুটেরা - অর্থাৎ এস্টাব্লিশমেন্টগুলোর সম্মিলিত চক্রান্ত। এতে যুক্ত হয়েছে কিছু দৈনিক ও সাপ্তাহিক গণমাধ্যমও। চারিদিকে মুক্তিযুদ্ধের সরকারবিরোধী অন্তহীন রটনা, অপপ্রচার ও গুজবের পাহাড়। শুরু হয় পাটের গুদামে আগুন, ব্যাঙ্কলুট, সম্মানহানি, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর প্রয়াস এবং সেই সাথে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভাইরাসের সংক্রমণে তৈরি হওয়া নানারূপ বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক দূষণের থাবার বিস্তার।
১৯৭৩ সালেরই মাঝামাঝি সময়ে, নিবিড়জন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর তাড়নায় তোড়ে, অগত্যা 'দৈনিক অমর বাংলা'র সহকারী সম্পাদকের পদে ইস্তফা দিয়ে, তাঁর পত্রিকা 'দৈনিক আন্দোলন'-এ যোগ দিই, বার্তা সম্পাদক পদে। বন্ধু হেনা ইসলাম ছিলেন সম্পাদক। ১৯৬৪ সালে সিটি কলেজে নৈশ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে মহিউদ্দিন চৌধুরী, হেনা ইসলাম ও আমি একসময় ব্যাচমেটে পরিণত হই। ওরা আর্টস, আমি কমার্স। ওরা সবাই দিনের বেলাকার ছাত্র, আমি রাতের। দৈনিক আন্দোলন পত্রিকা অফিসেই, ‘স্পার্ক জেনারেশন’ - এস্টাব্লিশমেন্টবিরোধী সাহিত্য আন্দোলনের জন্ম।
সেদিনের এমনই পরিবেশে এ দেশে কোনো ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক দুর্যোগ আসন্ন ভেবে সংঘটিত হয়েছিলো ছয়জন সাহিত্যকর্মীর উদ্যোগে চট্টগ্রামে এস্টাব্লিশমেন্ট বিরোধী সাহিত্য আন্দোলন। প্রকাশিত হয় লিটল ম্যাগাজিন - স্পার্ক জেনারেশান। এই সাহিত্য আন্দোলনের ক্ষুরতীক্ষ্ণ শ্লোগানসমূহের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোয় সমাসন্ন দুঃসময়ের বিষয়ে এ দেশের সকল সাহিত্যকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণের একটি আকাঙ্ক্ষা ছিলো। স্পার্ক জেনারেশানের আশঙ্কা বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে রোদনভরা হয়েছে। এ দেশে নেমে আসে এক ভয়ঙ্করতম আতঙ্ক জাগানো দিন। ১৫ই অগাস্ট ১৯৭৫ সালে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন তাঁর প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশের মাটিতে। দীর্ঘ দু'দশকেরও বেশি কাল ধরে চলেছে দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের দানবীয় নর্তনকুর্দন। তারপরে অবশ্য কিছু বদল হয়েছে।
১৯৭২-৭৩ সালের দিকে স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশে চট্টগ্রামে সাহিত্যে-শিল্পে বড়ো ধরনের সামাজিক ও মননশীল চর্চার জোয়ার এসেছিলো। দেশের অন্যত্রও দেখা গেছে একই চিত্র। তবে, সবার অগোচরে ক্রমশ ঘনায়মান কুটিল রাজনৈতিক কালোমেঘের সঞ্চার, চট্টগ্রামের স্পার্ক জেনারেশানের মতো, আরও কেউ টের পেয়েছিলো, এমনটি চোখে পড়ে নি।
ভাবছি,সেইসব দিন আর আজকের সময় কতো তফাৎ। স্পার্ক জেনারেশানের আন্দোলন নোতুন প্রজন্মকে প্রেরণা দিয়েছিলো। অনেকেই সেদিন স্পার্ক জেনারেশানের সদস্য হতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু আমরা কখনোই দলে ভারী হতে চাই নি। চেয়েছি, প্রত্যেকে আপন সত্তায় পরিচিত হোক। সমাজে রোমান্টিক সাহিত্য ভাবনার পাশাপাশি প্রতিবাদী সাহিত্যেরও ভাবুক হোক। আমরা কেবল নবীনদের সামনে স্বচ্ছ চিন্তার দুয়ার খুলে দিয়েছিলাম। প্রয়োজনে তপ্ত লোহায় বিনির্মাণের হাতুড়ির আঘাত করতে শিখিয়ে ছিলাম। চেতনার কাস্তের আলে শান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। স্পার্ক জেনারেশানের এই ভাষ্যগুলো সেদিনের সাহিত্যভাবুকদের উপযুক্ত উচ্চারণে সাহসী করে তুলেছিলো। এ কথা কেউ স্বীকার করে, আবার অনেকেই স্বীকার করে না। তাতে কারো কিছু যায় আসে না।
আজ সেভাবে কেউ লিটল ম্যাগাজিন চর্চা করে না। মোটা মোটা ঢাউস আকৃতির সংগ্রহশালা সাজান। পণ্ডিতজনেরা তাঁদের জ্ঞান-ভাণ্ডারের চৈতন উড়িয়ে শিষ্য সংগ্রহের ঝাঁ-চকচকে পিতলের ঘণ্টাবাদ্য বাজিয়ে যান। কর্পোরেট সংস্থসমূহ তাঁদের পৃষ্ঠপোষক। তাঁরা হলেন সুকুমার রায়ের বিখ্যাত ছড়া "এক যে ছিলো সাহেব,তাহার / গুণের মধ্যে নাকের বাহার" -এর চরিত্র। কর্পোরেট পু্ঁজি তাঁদের কখনও বানায় সাহেব, কখনও বানায় গাধা, আবার কখনও মুলোয় রূপান্তরিত করে। শিষ্যকুল এমন বহুরূপতায় মুগ্ধ হয়ে নিজেরাও একসময় হয়ে যায় বলির পাঁঠা। এ কৌশলের শিকার আমাদের একালের মেধা ও মনন। দেশ ও মানুষকে করায়ত্ত রাখার মোহন মেশিন কর্পোরেট সাহিত্য। তাকে তাপে রেখে রুটির মতো গোল হয়ে ফুলছে কর্পোরেট পুঁজি। সাহেবের নাকের আগায় ঝুলন্ত মুলোর ঘ্রাণ। তাকে ছুঁতে প্রাণপণে ছুটছে সাহিত্য ভুবনে কর্ণঝোলা প্রাণীরা।
এই ভাই, কেউ কি আছেন ? লোকায়ত জীবনের সর্বরসের নির্যাসে মানবসত্তার মহীয়ান বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসবেন ? এস্টাব্লিশমেন্টের প্রাকার ভেঙে দিয়ে প্রাণপ্রবাহের মুক্তধারাকে মুক্ত করে দেবেন!
লেখক : স্বপন দত্ত
কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক  
 
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সময় সংবাদের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতে পারে। লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় সময় সংবাদ নেবে না।

করোনা ভাইরাস লাইভ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop