ভ্রমণ শীতে ঘুরে আসুন মেঘ-পাহাড়-সমুদ্রের দেশে

০৩-০২-২০২০, ১৭:৪৫

সুজাউদ্দিন রুবেল

fb tw
শীতে ঘুরে আসুন মেঘ-পাহাড়-সমুদ্রের দেশে
ভ্রমণ সারা বছরের জন্যই, তবে শীতকালে ভ্রমণের চাহিদা একটু বেশি থাকে। তার অন্যতম কারণ হলো, শীতকালে আমরা কমবেশি সময় বের করি। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন কিংবা প্রিয়জনসহ দলবলে অনেকেই শীতে বের হয়ে পড়েন ঘুরতে। তাদের কাছে গরমের থেকে শীতকালটা ভ্রমণের জন্য প্রিয়। কারও পছন্দ পাহাড়, কারও সমুদ্র। আবার কারও সমতলের সবুজ। কারও কাছে বন, আবার কারও কাছে জলরাশিতে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। একেক জনের পছন্দ এক এক রকম। তবে এর সবকিছুই রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত নগরী কক্সবাজারে। পছন্দ অনুযায়ী ঘুরতে যেতে পারবেন যে কোনো জায়গায়।
শীতকালেই হচ্ছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার বেড়ানোর জন্য আদর্শ সময়। শীতের জন্য অনেকে বেছে নেন কক্সবাজার। হালকা শীতের মাঝে সমুদ্রের গর্জন নিশ্চয়ই আপনাকে শিহরিত করবে। শীতকালে সমুদ্রের পাড়ে বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় দেখা যায়। এখানে সামুদ্রিক আবহাওয়ার জন্য ঠান্ডার প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকে। সুতরাং এখন যারা কক্সবাজার যাবেন তারা উপভোগ করতে পারবেন সৈকতে ঢেউ আছড়ে পড়ার দৃশ্য, সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল জলরাশি ও সূর্যাস্ত। তাই দেরি না করে এই শীতে ঘুরে আসুন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ এই সমুদ্রসৈকত এ।
কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থানসমূহ:
কক্সবাজার শহরের প্রাচীন ঐতিহ্য আজগবি মসজিদ, অগ্গ মেধা বৌদ্ধ ক্যাং, বার্মিজ মার্কেট, রাডার স্টেশন, হিলটপ সার্কিট হাউজ, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, হিমছড়ি পাহাড়, ঝর্ণা ও সমুদ্র সৈকত, রামুর বৌদ্ধ বিহার, রাবার বাগান, চকরিয়াস্থ ডুলাহাজরা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, টেকনাফের সমুদ্র সৈকত, মাথিনের কূপ, সেন্টমাটিন প্রবালদ্বীপ, ছেঁড়াদ্বীপ, মহেশখালী জেটি, আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, কুতুবদিয়া বাতিঘর, উখিয়ার ইনানী পাথুরে সৈকত, কানা রাজার সুড়ঙ্গ, মেরিন ড্রাইভ রোডের সৌন্দর্য ও সাগরতলের অজানা রহস্য রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড।
কক্সবাজারে কি কি দেখবেন?
stay home stay safe
প্রাচীন ঐতিহ্য আজগবি মসজিদ:
কক্সবাজার ভ্রমণে আসা পর্যটকরা কক্সবাজারের প্রচীন ঐতিহ্য সমুহ ঘুরে দেখেন। এর মধ্যে আলোচিত হচ্ছে আজগবি মসজিদ। এটি ১৬০০-১৭০০ খ্রীষ্টাব্দে শাহ সুজার আমলে তৈরি হয়েছিল। এটি চৌধুরী পাড়া মসজিদ হিসেবেও পরিচিত। কক্সবাজার পৌরসভার বিজিবি ক্যাম্পের উত্তর দিকে এটি অবস্থিত। রিক্সা টমটম যোগে ওখানে যাওয়া যায়। কক্সবাজার পৌরসভার গেইট থেকে ভাড়া পড়বে ৭০ টাকা।
অগ্গ মেধা বৌদ্ধ ক্যাং:
কক্সবাজার শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭টিরও বেশী বৌদ্ধ ক্যাং রয়েছে। আগ্গা মেধা ক্যাং ও মাহাসিংদোগীক্যাং সবচেয়ে বড়। শহরের প্রবেশদ্বারের নিকটেই এর অবস্থান। দীর্ঘ আকৃতির সব বৃক্ষের ছায়ার নিচে গম্ভীর ভাবমূর্তি আপনাকে বিনম্র হতে বাধ্য করবে। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, কাঠের কলামগুলোতে খোদিত হয়েছে বুদ্ধের অসাধারণ সব প্রতিকৃতি। সংরক্ষিত রয়েছে বহু পুরনো হস্তলিপি। আরও সংরক্ষিত রয়েছে চুনাবালি ও ব্রোঞ্জের তৈরি বুদ্ধের মূর্তি। সাধারণ কিছু রীতি-নীতি মেনে যে কেউ ঘুরে দেখতে পারেন।
রাডার স্টেশন:
হিলটপ সার্কিট হাউসের দক্ষিণ পাশের চূঁড়ায় কক্সবাজার রাডার স্টেশনের অবস্থান। এখান থেকেই দেশব্যাপী ঝড়ঝঞ্জা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস দেয়া হয়। রাডার যন্ত্রটি সুইডিশ শিশুকল্যাণ সংস্থা ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় ১৯৬৮ সালে স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় তা আধুনিকীকরণ করা হয়।
হিলটপ সার্কিট হাউস:
জেলা পরিষদ ভবনের পশ্চিম দক্ষিণে পাহাড়ের চূড়ায় মনোরম পরিবেশে হিলটপ সার্কিট হাউসের অবস্থান। অল্পক্ষণের জন্য হলেও ভারতের দার্জিলিং এর মত মনে হবে। এর চূড়া থেকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গ ও পর্যটন নগরীর টপভিউ অবলোকন করা সম্ভব।
লাবণী সৈকত:
কক্সবাজারে লাবনী সৈকতের জনপ্রিয়তা অনেক উপরে। অনেকে কক্সবাজারের সবচেয়ে সুন্দর সৈকত বলেন এটিকে। থাকা-খাওয়া, যানবাহন থেকে শুরু করে প্রায় সবই এখানে হাতের কাছে পাবেন। অর্থাৎ যে কোনো মানের সার্বিক ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। নিকটেই শত শত ছোট দোকান পাবেন। সেখানে ঝিনুকের তৈরি উপহার সামগ্রী ও অলংকার বিক্রি হয়। এছাড়াও পাওয়া যায় সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণ সহযোগী উপকরণ যেমন হাফ, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, হ্যাট, ক্যাপ, ছাতা, চশমা ইত্যাদি। এই সৈকতে সার্ফিং করা ও বীচ বাইক চালানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
সুগন্ধা সৈকত:
সমুদ্র স্নানের প্রকৃত স্বাদ নিতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক সুগন্ধা সৈকত ভ্রমণ করে। সমুদ্রস্নানের পাশাপাশি স্কি-বোটে করে ভেসে বেড়ানোর ইচ্ছাটিও পূরণ করা যায় এখানে। রাস্তার দু’পাশে সামুদ্রিক তাজা মাছের হরেক পদ পরখ করে দেখার শখ কিন্তু অনেকেরই থাকে। এখানে সেই শখ মিটবে আপনার। এই সৈকতে চাঁদের আলোয় হাঁটার চমৎকার পরিবেশ রয়েছে।
দরিয়ানগর:
পশ্চিমে বিশাল বঙ্গোপসাগর, পূর্বে উঁচু পাহাড়। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। এই পথ ধরে কক্সবাজার থেকে আট কিলোমিটার এগিয়ে গেলে নজরে পড়বে সবুজশ্যামলে ভরা একটি গ্রাম বড়ছড়া। এই বড়ছড়ার উঁচুনিচু বিশাল পাহাড় নিয়ে গড়ে উঠেছে পর্যটনের বিনোদন কেন্দ্র ‘দরিয়ানগর’। দরিয়ারগরে উঁচু পাহাড়ের নিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার লম্বা আঁকাবাঁকা একটি সুড়ঙ্গ, নাম শাহেনশাহ গুহা। এছাড়া ১০০ ফুট উঁচু পাহাড় চূড়ায় ছন আর কাঠ দিয়ে তৈরি ‘চেরাংঘর’ বা ‘আড্ডাখানা’। এখানে বসে দেখা যাবে দরিয়া বা সমুদ্রদর্শন। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে মনে হবে, যেন বঙ্গোপসাগরের নীল জলের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেলিং করারও সুযোগ রয়েছে।
হিমছড়ি পাহাড় ও ঝর্ণা:
দৃষ্টি যত দূর যায়, আকাশ আর সমুদ্র মিশে একাকার। তারই এক পাশ দিয়ে ছুটে চলে গাড়ি। পথের আর এক পাশে সুদীর্ঘ পাহাড়। কক্সবাজার থেকে দক্ষিণে ১৫ কি.মি. দূরে হিমছড়ির অবস্থান। এবার ভেবে দেখুন, নিরিবিলি সেই সড়কে ছুটছে আপনাকে বহনকারী জিপ অথবা ব্যক্তিগত গাড়ি। হিমছড়ি একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট, একইসঙ্গে শুটিং স্পটও। এখানে একটি ঝরনাও রয়েছে। হিমছড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর যাত্রাপথের সৌন্দর্য।
ইনানী পাথুরে সৈকত:
নীরব পরিবেশই ইনানী সমুদ্র সৈকতকে অধিক জনপ্রিয় করে তুলেছে। দীর্ঘ সৈকতজুড়ে রয়েছে সোনালী বালু। স্বপ্নের মত পরিবেশ বলতে যা বোঝায় ইনানী তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সৈকতের পাশ দিয়ে বহু পুরনো কোরাল বোল্ডার (পাথর)। ধরুন কোনো একটি বোল্ডারে একাকী কিছুক্ষণের জন্য বসেছেন, অমনি একটি প্রকাণ্ড ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল আপনার সামনে। ফিরে যাওয়ার সময় সেই ঢেউ বালুকাবেলায় রেখে গেল নানা রঙের বাহারী সব ঝিনুক। ঢেউ পাথরের খেলা ইনানীতে নিত্তদিনের বিষয়। এখানকার সূর্যাস্ত যে কারোরই হৃদয় ভরিয়ে দেবে মুগ্ধতায়। এই সৈকত কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে ৩২ কি.মি. দূরে উখিয়ায় অবস্থিত।