আন্তর্জাতিক সময় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কেন এত সমস্যা?

১২-০১-২০২০, ১৬:২৪

মামুন শেখ

fb tw
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কেন এত সমস্যা?
বলা যায়, দুনিয়াজুড়ে অশান্তির আগুনের সবচেয়ে বড় জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্যের তেল। যেসব বৈশ্বিক গণমাধ্যম যুদ্ধের ইন্ধন জোগায় তাদের পেছনে আছে তেল কোম্পানিগুলোর বিশাল লবি। মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক যে প্রভাব তার পেছনেও আছে এই তেলের কারিশমা। যুক্তরাষ্ট্র ডলারটাকে বিনিময় মুদ্রার বদলে পণ্যের মতো ব্যবহার করে। ডলার ছাড়ানোর ক্ষমতা যেহেতু কেবল যুক্তরাষ্ট্রেরই আছে তাই এটার মূল্য তারা যা নির্ধারণ করবে তাই। সবাই সেটাই মেনে নেয়। আর এই তেলের বাজার এবং ডলারের দখল যেহেতু মার্কিনীদের হাতে তাই তেলের বাণিজ্য করতে গেলে সব দেশকেই ডলার কিনতে হয়; সে যতো শক্তিশালী দেশই হোক না কেন।
আমেরিকার অর্থনৈতিক এ শক্তি ধরে রাখতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের ধরে রাখার কোনো বিকল্প নেই তাদের হাতে। আর এজন্যই মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও তেলের জন্য যেকোনো সরকারই মেনে নিতে রাজি তারা। ঠিক একই কারণে ইরানেও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ফেলে দিয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র। আবার ইসলামি রেভল্যুশনের পর ইরানের আয়াতুল্লাহরা মার্কিনীদের এই তেল-ডলার খেল খতম করার জন্য নাছোড় বান্দার মতো লেগে আছে; যা ট্রাম্প-ওবামাদের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ।
ইরান-মার্কিন সংঘাতের ইতিহাস
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে গত ৪ জানুয়ারি ইরাকে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয় ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে। এই হত্যাকাণ্ডের পর দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতার নেতৃত্বে ছিলেন সোলাইমানি। এই বাহিনীকে গত বছর সন্ত্রাসী সংগঠন বলে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগনের দাবি, সম্প্রতি ইরাকে মার্কিন দূতাবাসে হামলার পেছনে ইন্ধন ছিলো তার। ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ জেনারেলের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে অন্তত ২২টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোড়ে।
গত অর্ধ-শতাব্দীর বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্কের নতুন ঘটনা এটি। কিন্তু, এই দুদেশের সম্পর্ক এই পর্যায়ে কীভাবে এল?
১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশ দুটির সম্পর্কের টানপোড়েন চলে আসছে।
১৯৫৩: অভ্যুত্থানের চক্রান্ত
তখন দেশটির তেল সম্পদের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো ব্রিটিশরা এবং বেশিরভাগ ইরানি এ থেকে কোনো সুফল পেতো না। আর তাই ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক চাইছিলেন তেল জাতীয়করণ করতে। মোসাদ্দেকের এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলো না যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন। ফলে ব্রিটিশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানে একটা অভ্যুত্থান চক্রান্ত করলো। অভ্যুত্থান সফল হয়। তারা প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তার জায়গায় বসায় মার্কিন সমর্থিত রেজা শাহ পেহলোভিকে। ক্ষমতায় আসিন হয়েই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেন রেজা শাহ। সাভাক নামের গোপন পুলিশ দিয়ে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করতেন তিনি। এসময় দেশটির ইসলামি নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির সাথে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর ফলস্বরূপ নির্বাসনে যেতে হয় খামেনির।
১৯৭৯: ইসলামি বিপ্লব
শাহ-এর দুঃশাসনের অতিষ্ঠ ছিলো মানুষ। তারা চাইছিলো শাহ-এর পতন। ১৯৭৯ সালে প্যারিস থেকে ইরানে ফেরেন খামেনি। এবার নির্বাসনে যেতে হয় শাহকে। তখন থেকেই ইরান একটি ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’। একইসঙ্গে খামেনি দেশটির সুপ্রিম লিডার হিসেবে আবির্ভূত হন। নতুন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভব ছিলো আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ওপর প্রথমবারের মতো অবরোধ আরোপ করে। ইরানিদের ক্রোধের আগুনে তখন ঘি ঢেলেছে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক রেজা শাহের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান চিকিৎসার জন্য। এটাই ইরানিদের আরো বেশি খেপিয়ে তোলে।
১৯৭৯-৮১: জিম্মি সংকট
উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষার্থীরা তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে বসে। এরপর ৫২জন আমেরিকানকে ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখে।
১৯৮০: ইরাক-ইরান যুদ্ধ
সীমান্ত বিরোধ এবং ইরাকের অভ্যন্তরে শিয়া জঙ্গিদের মদদ দেয়ার অভিযোগ তুলে ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ইরানে হামলা এবং অনুপ্রবেশ করে ইরাকি বাহিনী। যুদ্ধের সময় ইরানকে ঘায়েল করতে ইরাকে সাহায্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় আমেরিকা। 
সদ্য ঘটে যাওয়া ইরানি ইসলামি বিপ্লবের নাজুক অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধে দ্রুত সফলতা অর্জনের চেষ্টা চালান সাদ্দাম হোসেন। যুক্তরাষ্ট্রও চাইছিলো ইরাককে দিয়ে ইরানকে শায়েস্তা করতে। কিন্তু তা ইরানিদের প্রতিরোধে তা কার্যত পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। দুই বছরের মধ্যে ইরান তার হারানো প্রায় সমস্ত ভূ-খণ্ড পুনর্দখল করে ফেলে। এর পরের ৬ বছর ইরানি বাহিনী যুদ্ধে অগ্রসর ভূমিকায় ছিল। জাতিসংঘের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পরেও দীর্ঘ সময় ধরে চলে এ যুদ্ধ। ৮ বছর পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান।
১৯৮৮: গুলি করে বিমান ভূপাতিত
একের পর এক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সম্পর্ক তিক্ততর হচ্ছি। আমেরিকা এবং ইসরাইলকে প্রধান শত্রু হিসেবে অভিহিত করে ইরান। এরমধ্যে ১৯৮৮ সালে ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমান গুলি করে ভূপাতিত করে আমেরিকা। এই ঘটনাকে ভুল বলে স্বীকারও করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এজন্য কখনো ক্ষমা চায়নি তারা।
২০০২: অ্যাক্সিম অব এভিল
প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ কয়েকটি দেশকে ‘অশুভ শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার কথায়, দেশগুলো হলো- ইরাক, ইরান এবং উত্তর কোরিয়া। এরিমধ্যে শুরু হওয়া ইরানের পারমানবিক কর্মসূচির দিকে বিশেষভাবে নজর দেয় যুক্তরাষ্ট্র। একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপানো হতে থাকে দেশটির ওপর। ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধের জোগাড় হয়। মুখ থুবড়ে পড়ে দেশটির অর্থনীতি।
২০১৫: পরমাণু চুক্তি
শুরু থেকেই ইরান জোর দাবি করে আসছিল, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কিন্তু তার পরেও অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়ার বিনিময়ে তারা এ কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়। এরই ফল হিসেবে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ছয় বিশ্বশক্তির সাথে একটি চুক্তি করে। এর পর থেকে ইরানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। কিন্তু ২০১৮ সালে এ চুক্তি থেকে এক তরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখানেই শেষ নয়। তিনি কঠোরতর অবরোধ আরোপ করেন ইরানের ওপর। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। 
২০২০: সালাইমানি হত্যা
২০১৯ সালের পুরোটা জুড়েই ছিলো ট্রাম্প এবং খামেনির মধ্যে উত্তেজনায় ভরা। আর ২০২০ সালের শুরুতেই খামেনির ঘনিষ্ঠ জেনারেলকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। কার্মিনীদের দাবি, সম্প্রতি ইরাকে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনায় মদদ ছিলো সোলাইমানির। ইরাকের মাটিতে ইরানি এ জেনারেলকে হত্যা সাম্প্রতিক সময়ে দুদেশের বৈরি সম্পর্কের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যার ফলশ্রুতিতে প্রথমবারের মতো মার্কিন কোনো ঘাটিতে সরাসরি মিসাইল হামলা চালালো ইরান।
মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার সময় ইউক্রেনের একটি যাত্রীবাহী বিমানেও ভুলবষত মিসাইল ছোড়ে ইরান। এতে বিমানের ১৭৬ আরোহীর সবাই নিহত হন। এর জের ধরে বিক্ষোভ ছড়ায় তেহরানে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শুরু করা এ বিক্ষোভে আয়াতুল্লাহ খামেনির পদত্যাগ পর্যন্ত দাবি করা হয়। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়ে টুইট করতেও সময়ক্ষেপণ করেননি ট্রাম্প।
সম্প্রতি যুদ্ধ পরিস্থিতির পর আপাতত দুদেশকেই শান্ত মনে হলেও এই বৈরিতা যে দ্রুত শেষ হচ্ছে না তা মোটামুটি নিশ্চিত। আর এই উত্তেজনা বিশ্বকে কোনদিকে নিয়ে যায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

করোনা ভাইরাস লাইভ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop