মুক্তকথা মোবারক হোসেন খান: যন্ত্র সঙ্গীতের এক নক্ষত্রের পতন

২৮-১১-২০১৯, ১৭:২৯

সাবিত সারওয়ার

fb tw
মোবারক হোসেন খান: যন্ত্র সঙ্গীতের এক নক্ষত্রের পতন
উপমহাদেশের বিখ্যাত এক সঙ্গীত পরিবারের ছেলে বাদ্যবিশারদ মোবারক হোসেন খান। সংগীত বিষয়ক নানা গ্রন্থরচনা এবং যন্ত্র সংগীতের খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব তিনি।  গত ২৪ নভেম্বর না ফেরার পথে যাত্রা করেন মোবারক হোসেন।
পাণ্ডিত্যপূর্ণ কর্ম বলয়ে সফলতার উজ্জ্বল আভায় উদ্ভাসিত তার বর্ণাঢ্য জীবন। দীর্ঘ তিন যুগ তিনি রেডিওতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত ছিলেন। চাকরি জীবনেও ছিলেন একজন সফল মানুষ। সংগীত এবং যন্ত্রসংগীতকে উপজীব্য করে অর্ধশতাধিক গবেষণালব্ধ গ্রন্থ প্রণেতা তিনি। তার স্ত্রীর নাম ফাওজিয়া ইয়াসমিন। পেশায় একজন গৃহিনী। একমাত্র কন্যা রিনাত ফাওজিয়া একজন প্রফেসর এবং দুই ছেলে তারিফ হায়াত খান ও তানিম হায়াত খান দুজনেই আর্কিটেক্ট। সাংসারিক জীবনে অত্যন্ত সফল এবং সুখী একটি মানুষ ছিলেন তিনি। এই প্রাজ্ঞ পণ্ডিতের মৃত্যুর আগে এক আলাপচারিতায় উঠে আসে তার জীবন সংগ্রামের আদ্যোপান্ত। সেই আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তরুণ কবি ও সাংবাদিক সাবিত সারওয়ার।
তিতাসের তীরে গড়ে ওঠা ছোট্ট এক শহরের নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। শহরটির পাশেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী শিবপুর গ্রাম। সকাল-সন্ধ্যায় প্রতিধ্বনিত হয় গান-গজলের রেওয়াজ। এখানকার সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারের মাত্র ১২ বছরের একটি ছেলে। নাম তার মোবারক হোসেন খান। ফর্সা চেহারা। চোখে মুখে প্রতিভার দীপ্তি। স্কুলের স্যার একদিন তাকে ডেকে বললেন তুমি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র জীবনী লিখে আমাকে দেখাবে। ছেলেটি শ্রদ্ধায় নত হয়ে বললো, স্যরি স্যার, এই ‘রচনা’ লিখে কি লাভ? চেহারায় চোখ বুলিয়ে একটু ধমকের সুরে স্যার বললেন, রচনা কি প্রবন্ধ সেটা আমি বুঝবো। তুমি লিখে ফেল। যথাসময়ে লেখাটি তৈরি হলো। মানসম্মত একটি রচনা। স্যার দেখে বেশ খুশি হলেন। স্কুল ম্যাগাজিনেও লেখাটি ছাপা হলো। এভাবেই প্রতিভা বিকাশের এক পরিবেশে বেড়ে ওঠা তার। দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ তিনি রেডিওতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বেতারের ডিজি ছিলেন। নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক এবং নজরুল ইন্সিটিটিউটের চেয়ারম্যান হিসেবে। সংগীত এবং যন্ত্রসংগীত প্রসঙ্গে প্রায় ৫০টির অধিক গবেষণালব্ধ গ্রন্থ প্রণেতা তিনি। অসামান্য এই কীর্তিমান সংগীতজ্ঞ এবং বাদ্যপণ্ডিত স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।
১৯৩৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার অন্তর্গত শিবপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র ভ্রাতুষ্পুত্র এবং ওস্তাদ আয়েত আলী খানের কনিষ্ঠ পুত্র মোবারক হোসেন খান। তার মায়ের নাম উমার উন-নেসা। বাবা মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনিই সবার ছোট। প্রথম তিন বোন- আম্বিয়া, কোহিনূর আর রাজিয়া। তারপর ভাই আবেদ, বাহাদুর এবং সর্বশেষ মোবারক হোসেন খান। তাদের বাবার বড় শখ ছিল ছোট ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে অনেক বড় মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। কেননা পারিবারিক ঐতিহ্য মতো অন্যান্য ছেলেরা ইতোমধ্যে সংগীতের মাঝে ডুবে আছে। সুতরাং স্কুলে ভর্তি করা হলো তাকে। তখন মাইনর স্কুল প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত। প্রতি ক্লাসে সেরা ছেলেদের তালিকায় তার নামও উঠে এলো। যেমনটি তিনি উল্লেখ করেছেন তার লেখা ‘আমার স্মৃতি’ গ্রন্থে । তিনি বলেছেন, ‘আমি হাতে কোন বাদ্যযন্ত্র নেবার আগেই ‘শিশুশিক্ষা’ হাতে নিয়েছি। ফলে সঙ্গীতচর্চা পাশাপাশি চলতে পারেনি। পড়াশোনার প্রতি হয়তো ঝোঁকটা আমার একটু অধিক ছিল। তাই গান-বাজনার চেয়ে সেদিকেই আমার জীবনের গতি পরিচালিত হয়েছিল। তবে একেবারে যে সংগীতের চর্চা করিনি সেটাও নয়। সংগীতের অনুশীলন করেছি নিয়মিত।’ 
একবার এক মজার ঘটনা ঘটে যায়। শৈশবের সেই স্মৃতি আজো তাকে আন্দোলিত করে। ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে গিয়ে এভাবেই স্মৃতি চারণ করছিলেন তিনি ‘সম্ভবত তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আমি। পরীক্ষা শেষ। খাতা দেখা হচ্ছে। শিক্ষকরা তখন ক্লাসে পড়াবার সময়ই খাতা দেখাতেন। যাদব স্যার ক্লাসে বসে একদিন অঙ্কের খাতা দেখছেন। আমার খাতার নম্বর উঠে গেছে ১১০। এ অবস্থা দেখে তো তিনি হতভম্ব। বারবার গুনে নম্বর যোগ করে মিলাচ্ছেন। একশ পাবার কথা কিন্তু যোগে প্রত্যেক বার ফল দাঁড়াচ্ছে একশ দশ। স্কুল থেকে আমাদের বাসা খুব দূরে নয়। তিনি ক্লাসের একটি ছেলেকে আমাকে ধরে আনতে পাঠালেন। আমি তখন ভয়ে তো একেবারে ঠাণ্ডা। কিন্তু না গিয়ে উপায়ও তো নেই। সুতরাং আমি গেলাম। আমাকে দেখেই তিনি বলে উঠলেন, দুষ্টুমিতেও তুই এক নম্বর, অঙ্কের খাতায় নম্বর বেশি তুলতেও এক নম্বর। কিন্তু একশতে একশ দশ পেলি কিভাবে সে রহস্য বের করে দে। আমি খাতাটা স্যারের হাত থেকে নিয়ে উল্টে দেখলাম। রহস্য ভেদ করতে বেশি দেরি হলো না। তখন যদিও রহস্য-কাহিনীর গোয়েন্দা আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় নায়ক। নিজেকে সেই মুহূর্তে একজন বিরাট গোয়েন্দা বলে মনে হলো। আমি স্যার কে বুঝিয়ে দিলাম। একটা অঙ্কের রাফ করেছিলাম পাশে। অঙ্কটা আর কাটা হয়নি স্যার। রাফ এবং ফেয়ার দুটোতেই দশ করে দিয়েছেন। ফলে দশটি অঙ্কের প্রতিটির দশ করে একশ এবং রাফটার জন্য দশ, এই মোট একশ দশ নম্বর হয়েছে। ভুলটা বের হতেই স্যার হো হো করে হেসে উঠলেন এবং বললেন, দশটা রসগোল্লার স্থলে বুঝি এগারোটা রসগোল্লা খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছিলো। ভালো ভালো, কাল তোর জন্য এগারোটা রসগোল্লাই নিয়ে আসবো। দেখি খেতে পারিস কি না। আমি কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি আমাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, খুব খুশি হয়েছি। যাদব স্যাবের অঙ্কের সেই রসগোল্লার কথা আমার আজও মনে পড়ে।’
১৯৪৭ সালে মোবারক হোসেনের বাবা ওস্তাদ আয়েত আলী খান সপরিবারে চলে এলেন কুমিল্লা। দেশ বিভাগের আগে থেকেই তার বাবা কুমিল্লায় যেতেন ছাত্র-ছাত্রীদের গান বাজনা শেখাতে। কুমিল্লাতে তখন গান বাজনার খুব প্রচলন ছিল। সেই থেকে সপরিবারে তাদের কুমিল্লা বসবাস। ব্রাহ্মণ বাড়িয়া ছেড়ে কিছুতেই ভাল লাগছে না তার।  তবুও যেতে হলো। কিন্তু মন টিকছে না কিছুতেই। বার্ষিক পরীক্ষা হবার পর আবার চলে এলেন কুমিল্লা। ভর্তি হলেন জেলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে। পড়ালেখায় যেমন ছিলেন মেধাবী তেমনি বালকসুলভ দুষ্টুমিতেও সেরা। পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে সঙ্গীতের স্রোতে টানলেও একাডেমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন সর্বাধিক। শৈশবের শিক্ষাজীবনে বিভিন্ন কালচারাল প্রোগ্রামের নেতৃত্ব ছিল তার হাতে। কখনো যাত্রা কখনো বাদ্যযন্ত্র বাদন আবার কখনো বা নাটকের অভিনয়ের নায়ক চরিত্রে তিনি মঞ্চে হাজির । যেমনি শোনা গেল তার নিজের জবানিতে- ‘ছোটবেলার অনেক মজার মজার ঘটনা আমার জীবনকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছিলো। নাটকের প্রধান চরিত্র আমার চাই। খেলাধুলার মূল ভূমিকায় আমি। আবার দুষ্টু বুদ্ধিতেও আমিই সবার আগে।’ এভাবেই চমৎকার এক শৈশব পার করেছেন তিনি।
ইতোমধ্যে অনেকগুলো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ১৯৫২ সালে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করলেন মোবারক হোসেন খান। এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে এম এ করেন। ফলে সহজেই বোঝা যায় বাবার লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহের কারণে তিনি যে বিদ্যার জগতে প্রবেশ করেন তার পরিসমাপ্তি হয় স্নাতকোত্তরে গিয়ে। এরও আগে তিনি যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র। তখন কলেজ থেকে ‘সংহতি’ নামে একটি দেয়াল ম্যাগাজিন বের হতো। এক সময় ম্যাগাজিনটির সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ে তার ঘাড়ে। এখানে কাজ করতে গিয়ে তিনি বেশ আনন্দ অনুভব করলেন। তার সম্পাদনার মেয়াদ পূর্ণ হলে বায়োলজির খাতার মলাট দিয়ে বাধাই মতো করে পত্রিকাটি প্রিন্সিপ্যাল স্যারকে উপহার দিলেন। প্রিন্সিপ্যালের নাম ছিল আক্তার হামিদ খান। যিনি সমগ্র বিশ্বে গ্রামীণ চাষাবাদ বিষয়ক কর্মের জন্য পরিচিত ছিলেন। মোবারক হোসেন খানের অভিরুচি এবং এমন শিল্পিত কাজ দেখে তিনি তাকে লিখিত একটা সার্টিফিকেট দিলেন। এ ঘটনায় মোবারক অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হলেন যে, প্রিন্সিপ্যাল আক্তার হামিদ খান তাকে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। এটা তার জন্য অনেক গর্বের ব্যাপার। এভাবেই শিক্ষাজীবন থেকে শুরু হয় তার লেখালেখির আগ্রহ। পড়াশোনা শেষ। এবার কর্মজীবন।
১৯৬২ সালের ২০ অক্টোবর মোবারক হোসেন খান জয়েন্ট করেন রেডিওতে। প্রোগ্রাম প্রডিউসার হিসেবে তার নিয়োগ। যদিও পরবর্তীতে রেডিওর সর্বোচ্চ পদে প্রমোশন পেলেন তিনি। সুদীর্ঘ ৩০টি বছর বিভিন্ন পদে সেখানে কাজ করেছেন। চাকরি করেও অফুরন্ত সময় তার হাতে। শুরু করলেন লেখালেখি। সেসময় সংগীত বিষয়ক খুব একটা লেখা দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হতো না। অবশ্য এখনকার মতো এতো পত্রিকাও ছিল না। পত্রিকা বলতে তখন আজাদ আর ইত্তেফাক। আজাদে তিনি গেলেন না। তিনি গেলেন ইত্তেফাকে। লেখার সাবজেক্ট দেখে ইত্তেফাক থেকে বলা হলো এতো ভারি বিষয়বস্তু, এর তো পাঠক মিলবে না। হতাশ না হয়ে তিনি গেলেন দাদা ভাইয়ের কাছে। দাদা ভাই মানে ইত্তেফাকের তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই। যিনি কঁচি কাচার আসরের প্রথম সম্পাদক। তিনি মোবারককে বললেন আপনি লেখেন আমিই  ছাপাবো। তখন দাদা ভাইয়ের প্রেরণায় প্রথম সংগীত বিষয়ক লেখা প্রকাশ হয়। এরপর তো এখন বেশ ছাপা হচ্ছে। 
এক সময় তিনি গেলেন শিল্পকলা একাডেমীতে। সম্ভবত কবি আল মাহমুদ তখন শিল্পকলা একাডেমীর সহকারী পরিচালক। কবির সাথেও বেশ সখ্য তার। তিনি দেখা করলেন কবি আল মাহমুদের সাথে। উদ্দেশ্য শিল্পকলা একাডেমী থেকে সঙ্গীত বিষয়ক একটি বই প্রকাশ করা। যেমনটি তিনি বলছিলেন, ‘আমরা দু’জনই ব্রাহ্মণ বাড়িয়ার মানুষ সুতরাং আমি আল মাহমুদকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসঙ্গ টেনে বললাম মাহমুদ ভাই সংগীত বিষয়ক আমি একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছি। আমি চাই বইটি আপনার হাত দিয়ে শিল্পকলা থেকে প্রকাশিত হোক। বইটির নাম ‘সংগীত প্রসঙ্গ’। যদিও তখন একাডেমীর পরিচালক যিনি ছিলেন তিনি রেডিওর সুবাদে আমার পরিচিত। কিন্তু আমি ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া পছন্দ করি না। আমি তাকেও গিয়ে বললাম, আমার একটি বই আসবে ওটা আল মাহমুদ সাহেব প্রসেস করবে আপনি একটু দেখবেন। সত্যিই শিল্পকলা একাডেমি থেকে বইটি প্রকাশ পেল।’
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো নিয়ে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গ’। বেশ ভালোই চলে বইটি। বোদ্ধামহলেও প্রশংসা পায়। বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গে যেমনটি বলেন তিনি,  ‘বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গ বলতে কিন্তু একটিমাত্র বিষয় থাকে না। এরমধ্যে সমগ্র সংগীত চলে আসে। এ কথা চিন্তা করেই আমি লিখলাম ‘সংগীত মল্লিকা’ ‘কণ্ঠ সাধন’ এবং ‘যন্ত্র সাধন’। আমার সংগীত মল্লিকা যে পড়বে সে মোটামুটি থিওরিগুলো জানতে পারবে। যারা যন্ত্রসঙ্গীত সাধনে আগ্রহী তাদেরকেও থিওরি সম্পর্কে পড়াশুনা করতে হবে।’
সব মিলিয়ে যন্ত্রসংগীতে প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা যখন অর্ধশতাধিক, তখন তিনি চিন্তা করলেন এবার একটু অনুবাদে হাত দেবেন। তিনি চলে গেলেন নিউ মার্কেট। তিনটি বই কিনলেন, এর মধ্যে একটি ছিল নাইজেরিয়ান গল্প বা উপন্যাস। বইটি পড়ার পর বিস্ময়ে অভিভূত হলেন তিনি । বসে পড়লেন এবং শুরু করলেন অনুবাদ। ধ্যানস্থ চিত্তে খুব অল্প সময়ে শেষ করলেন বইটির অনুবাদ। একই সাথে আরো একটি বইয়ের অনুবাদ করলেন। অনুবাদ করা এ বইটির নাম দিলেন ‘নিঃসঙ্গ’। অসাধারণ লোক কহিনী এটি। তার অনুবাদ দেখে আশরাফ সিদ্দিকীর মতো লোকসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ একজন লোক ছিলেন যার নাম আব্দুল হাফিজ। যিনি বাংলা এবং ইংরেজি দুটোতেই এম এ। প্রয়াত এই ভদ্রলোক মোবারক হোসেন খানের অনুবাদ ক্ষমতার দক্ষতা দেখে আশ্চর্য হলেন। তিনি বললেন, মোবারক তুমি এটি কি করেছ, অসম্ভব সুন্দর একটি কাজ করেছো। এরপরে আরো বেশ কিছু অনুবাদ করে অনেকের প্রশংসাও পেয়েছেন তিনি। সেইসব অনুবাদ থেকে এক সময় ‘ইভানক’ নামে একমাত্র নাটকের বই প্রকাশিত হয়। নাটকটি টেলিভিশনেও প্রচার হয়েছে।
আধুনিক গান প্রসঙ্গে তিনি মনে করতেন ক্লাসিক্যাল ধারণা ছাড়া ভালো কোন ক্ষেত্র তৈরি করা মুশকিল। হয়তো সাময়িক কিছু বাহবা মিলবে কিন্তু সত্যিকারের আত্মতৃপ্তি আসবে না।’
পেশাগত জীবনের নানা কর্মযজ্ঞের মাঝেও সঙ্গীত এবং যন্ত্রসংগীত বিষয়ে লিখেছেন মূল্যবান অনেক বই। তিনি বাচ্চাদের সঙ্গীত শিক্ষা বিষয়কও লিখেছেন প্রচুর। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সংগীত প্রসঙ্গ, বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গ, সঙ্গীত সাধনা, সঙ্গীত সাধক অভিধান, রাগ সঙ্গীত, যন্ত্রসাধন, সঙ্গীত গুণীজন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান ও তার পত্রাবলি, সঙ্গীত মল্লিকা, মুক্তিযুদ্ধের গান, আমি যে বাজিয়েছিলেম, সঙ্গীত দর্পণ, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, গড়লো যারা সুরের তাজ মহল, সঙ্গীতামৃতা, আমার সঙ্গীত স্বজন, গীতা মঞ্জুরি, ১০ সঙ্গীত স্রষ্টা, নজরুল সঙ্গীতের বিচিত্র ধারা, নজরুল সঙ্গীত প্রসঙ্গ, নজরুল সংগীত সমগ্র, ওস্তাদ আয়েত আলী খান, লালনসমগ্র (সংকলিত), হাসন রাজা সমগ্র (সংকলিত)। শিশুদের জন্য লিখেছেন, সুর লহরী, সুরের রাজা, সুর নিয়ে যার খেলা, বাংলাদেশের বাদ্যযন্ত্র, ছড়াগান, সুরেলা টইটম্বুর, সঙ্গীত সাধক, ছোটদের সারেগামা, সঙ্গীত বিদ্যা, ছোটদের সঙ্গীত গুণীজন, বাংলাদেশের মুসলিম সংগীত সাধক, দেশের গান, ছোটদের ওস্তাদ আলাউদ্দিন, ওস্তাদ আয়েত আলী খান, ছোটদের অমির খসরু ইত্যাদি। এছাড়াও ইংরেজি ভার্সনে লেখা তার Music and its Study, Islamic Contribution to South Asian’s Classical Music, Ustad Alauddin Khan: Legend in Music. এবং অন্যান্য গ্রন্থগুলো দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে Reference Book হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
সঙ্গীত বিষয়ক বিস্তৃত এই কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন বহু সম্মাননা এবং পুরস্কার। এগুলো হচ্ছে, সঙ্গীতক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮৬ সালে। সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে পেয়েছেন ‘কুমিল্লা ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক, ১৯৯৪ সালে সঙ্গীতে পেয়েছেন স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন ২০০২ সালে। অনুবাদে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার সহ জীবনে নানাভাবে সম্মানিত হয়েছেন কীর্তিমান এই সঙ্গীত বোদ্ধা।
এ ছাড়াও দেশ বিদেশের বহু সংগঠন ও সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান করেছেন তিনি। ভ্রমণ করেছেন বহু দেশ। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, জাপান, রাশিয়া, ফেডারেশন সাইবেরিয়া, কানাডা, কলম্বিয়া, উত্তর কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তান। 
পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন মোবারক হোসেন খান। সঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত কিংবা তার সাধনার যে ক্ষেত্রটি ছিল তার কতটুকু সমাপ্তি টানতে পেরেছেন তিনি। এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার পিতৃব্য ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে ঠিক একই ধাচের একটি প্রশ্ন করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি তো সারা জীবন সঙ্গীতের সাধনা করে গেলেন কিন্তু সুরদেবীর নাগাল কি পেয়েছেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি সাধনা করেছি। সিদ্ধি লাভ করতে পারিনি। সুরকে সারাজীবন ধরে খুঁজেছি। খোঁজার পথই হলো সাধনা। সুরকে খুঁজতে গিয়ে সাধনা করে গেলাম। আল্লাহর দুনিয়াতে যদি তিনশ’ বছর বাঁচতাম তাহলে সাধনা করেই যেতাম। আর সিদ্ধি? সেকি ধরা দেয় রে, সে তো অধরা।’  
এটা শুধু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কথাই নয়। আমি মনে করি কথাগুলো আমার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক।

করোনা ভাইরাস লাইভ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop