মুক্তকথা আমরা আসলে টেস্ট ক্রিকেট খেলি কেন?

২৪-১১-২০১৯, ২১:৪০

সৈয়দ ইফতেখার

fb tw
আমরা আসলে টেস্ট ক্রিকেট খেলি কেন?
আরও একবার পর্যুদস্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম। আরও একটা পরাজয়। বলতে পারেন উনপাঁজুরে দল নিয়ে কি আর করা সম্ভব! কিন্তু টেস্টের রাজসিক অঙ্গনে ১৯ বছর পেরিয়ে আসা দলটি এখনও যে দুর্বল তা কী করে বিশ্বাস করবে ক্রিকেট ভক্তরা! কোটি বাঙালির বিশ্বাস সব সময়ই যে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে রয়েছে। অথচ সেই বিশ্বাসে বারে বারে চিড় ধরাচ্ছেন মুশফিক, মাহমুদুল্লাহরা। ইনিংস হারকে যেন নিয়মে পরিণত করেছেন তারা।
অভাবটা আত্মবিশ্বাসের। ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলার মানসিকতা নেই, এমনটাই বলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের মহারাজ, দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) বর্তমান প্রেসিডেন্ট দাদা সৌরভ গাঙ্গুলি। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে সোয়া দুইদিনে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচটা শেষ হওয়ায় কোটি কোটি ক্রিকেট অনুরাগীর মতো হতাশ তিনিও। কারণটা অনেকাংশে বাণিজ্যিক বলাই যায়। এতো দিন বাংলাদেশ দাবি করে এসেছে, ভারত তার নিজ মাটিতে খেলার সুযোগ দেয় না। কেন দেয় না? বাংলাদেশ কি যোগ্য দল নয়, বাংলাদেশের কি অধিকার নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিবেশীর দাবিও তুলেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। কিন্তু এতো বছর পর যখন সুযোগটা এলো তখন বিসিসিআই ও তার কর্তারা সরাসরি চোখে আঙুল দিয়ে না দেখালেও ক্রিকেট পাগল মানুষের আর বুঝতে বাকি নেই যে আমরা এখনও কতটা নাজুক ক্রিকেট পাড়ায়। বিশেষ করে টেস্টে। বাংলাদেশের মতো কন্ডিশনেও আমরা পারলাম না কিছু করতে। জয় দরকার নেই, অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হলো না।
মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে প্রথম টেস্ট শেষ হতে লেগেছে মাত্র তিনদিন। শনিবার খেলা শেষ হয়েছে। ছুটির দিন রোববার কোটি কোটি ভারতীয়র আয়েস করে টেস্ট খেলা দেখার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। ছুটির দিনে টেলিভিশনগুলোর বিজ্ঞাপনী বাজারে প্রভাব পড়েছে। স্পন্সরদেরও ক্ষতি কম নয়। সব কিছুকে পাশ কাটিয়ে ফলাফল ইনিংস ও ১৩০ রানে টিম টাইগারদের হার।
আর দ্বিতীয় টেস্টে, তৃতীয় দিনের শুরুতে বাংলাদেশের ইনিংস ও ৪৬ হানের হারে ভারতীয় অনেক সমর্থকও অখুশি বটে। কারণ হার জিতের চেয়ে একটা উপভোগ্য খেলা যে তারা দেখতে চেয়েছিলেন তা আর হলো না। ১৯ বছর আগে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেছিল তাতেও ভালো স্কোর ছিল টাইগারদের, অথচ ১৯টা বছর পর ২০ বছরে পা দিয়েও আরও পিছিয়েছে এ দেশের টেস্ট ক্রিকেট। তাই তো নতুন সংস্করণ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তলানির দলটির নাম এখন বাংলাদেশ।
সৌরভ ম্যাচ শেষে, বিরাট কোহলির উদাহরণ টেনেছেন। বলেছেন, কোহলি যখন খেলেন; তখন প্রত্যেকটা বলই তিনি শেষ বল এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বিবেচনা করে মুখোমুখি হন। কিন্তু বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের বেলায় সে বিষয়টির ঘাটতি দেখেছেন তিনি। মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ, তামিম, সাকিব ও মোস্তাফিজের নাম উচ্চারণ করে সৌরভ বলেছেন, তাদের রয়েছে যোগ্যতা কিন্তু তারা তা কাজে লাগাতে পারছেন না। যদিও সাকিব, তামিম নেই, থাকলে হয়ত ফলাফল একটু ভিন্ন হতে পারতো কিন্তু টেস্টের ‘শিশু সদস্য’ আফগানিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে হারের কথা ভুলে যাই কী করে! চট্টগ্রামের সেই টেস্টে এক ইনিংসেও আড়াইশ রানই করতে পারেনি বাংলাদেশ! পরিণাম ২২৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হার। এক রশিদ খানের কাছে কাবু হয় টাইগাররা। তার আগে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে দুই টেস্টের দুটোতেই ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। প্রথম টেস্টে এক ইনিংস ও ৫২ রান, দ্বিতীয়টিতে এক ইনিংস ও ১২ রান। তারও আগে ধুঁকতে থাকা জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও টেস্টে জয় আসেনি, এসেছে ড্র। আরেকটু আগে উইন্ডিজদের সঙ্গেও ওয়াইটওয়াশ হতে হয়েছে। তারও আগে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে টেস্ট হার। যার বেশিরভাগই ছিল ইনিংস পরাজয়। বাংলাদেশ এ নিয়ে মোট ৮৮টি টেস্ট ম্যাচ হারলো। যার মধ্যে ৪২টিই ইনিংসে হার। অথচ ১১৪টি টেস্ট খেলে ফেলেছে। জয় মাত্র ১৩টিতে। যা অতি সামান্য। এখন প্রশ্ন হলো, আর কতকাল টেস্টে হারতে থাকবে বাংলাদেশ? তাই তো সোজাসাপ্টা প্রশ্ন জাগতেই পারে, ‘আমরা আসলে টেস্ট ক্রিকেট খেলি কেন?’
ইডেনের টেস্টটা ঐতিহাসিক। প্রথম দিন মাঠে ছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন। দিনরাতের ম্যাচে, গোলাপি বলে, নবম ও দশম দল হিসেবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও ভারতের খেলা দেখেন প্রধানমন্ত্রী মাঠে বসে। নতুন অধিনায়ক মুমিনুল হকের জন্যও ছিল চ্যালেঞ্জ। তবে সব চ্যালেঞ্জ উড়িয়ে দিয়ে অসহায় হয়ে ব্যাটসম্যানদের যাওয়া-আসার মিছিল দেখেছি আমরা। মুমিনুল অধিনায়কত্বের ভারে আরও ভেঙে পড়লেন। এক সময়ের বাংলার  ব্র্যাডম্যান খ্যাত মুমিনুল দুই টেস্টেই ব্যর্থ। আর মুশফিক কিছু রান করেছেন ঠিকই, কিন্তু তা দলকে কোনো ধরনের সম্মানের জায়গাতে নিয়ে যেতে পারেনি। শতভাগ ব্যর্থ ওপেনার ইমরুল কায়েস। মাহমুদুল্লাহও ভুগেছেন ফিটনেসের অভাবে। সব মিলিয়ে ‘পিংক টেস্ট’ হয়ে রইলো আমাদের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের নার্ভাস ব্যাটিংয়ের ভয়ংকর উদাহরণ। যেখানে ভারতীয় ক্রিকেটাররা একের পর এক টেস্ট খেলে হাসিমুখে জিতে, কোনো ধরনের ক্লান্তি কাজ করে না, সেখানে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের টেস্ট খেলতে গেলেই শুকিয়ে আসে গলা!
শোনা যায়, ক্রিকেটাররা টেস্ট খেলতে চান না। মূলত আগ্রহ কম। উপভোগও করেন না। অর্থকড়ি কম পান বলেও অভিযোগ তাদের। ক্রিকেটের ভিত্তি যে টেস্ট, এ কথা মাথায় নেই তাদের। বিসিবিও মাথায় দিতে পারছে না। তাই আলাদা করে টেস্ট দল গঠন করেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ঘরোয়া লিগগুলোতেও টেস্টে ক্রিকেটারদের খেলা নিয়ে উদাসীনতা রয়েছে। ঘরোয়া ক্রিকেটের নিম্নমান, ভালো মানের পিচের অভাব, দুর্বল পাইপলাইন, খেলোয়াড়দের ফিটনেসে ঘাটতি, টেম্পারমেন্ট-স্কিলে ঘাটতি ছাড়াও টি-২০ এবং ওয়ানডে নিয়ে শর্টকাটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাফল্য পাওয়ার মানসিকতার মতো সমস্যা তাই দূর হয়েও হচ্ছে না।
প্রয়োজনে সারা বছর (কেবল বর্ষাকাল বাদে) মাঠে রাখতে হবে টেস্ট ক্রিকেট। হতে হবে দিনরাতের ক্রিকেটও। ৬৪ জেলায় প্রতিভা অন্বেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাজারে হাজার তরুণ তুর্কি তুলে আনতে হবে। পুরো দমে চালু করতে হবে স্কুল ক্রিকেট। প্রচুর খেলেতে খেলতে যারা নিজেদের ফিটনেস ও মানসিকভাবে দৃঢ়চেতার জায়গায় নিজে যেতে পারবেন তারাই তখন টিকে থাকবেন। তখনই ভালো মানের টেস্ট ক্রিকেটার পেতে পারি আমরা। একজন ভালো মানের টেস্ট ক্রিকেটার গড়তে শুরু থেকেই প্রচুর অর্থ দিয়ে খেলোয়াড়দের লালন-পালন করতে হবে। এর মধ্য থেকেই ওয়ানডে আর টি-২০-এর জন্য হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান ও টানা ভালো লেন্থ-লাইনে বল করার ক্রিকেটারও আমরা পেয়ে যাবো।
ভারত যখন দেশব্যাপী দিনরাতের গোলাপি বলের ক্রিকেটে জোর দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এমন খেলাই হয়নি কখনো! নেই ভাবনাতেও! তাহলে কী করে আমরা আশা করি ভালো কিছু হবে? দায়টা কি বিসিবির নয়? অভিভাবক সংস্থাই যখন ব্যর্থ, তখন সন্তানরা আর ভালো কি করবে এমন প্রশ্নও জনমনে রয়েছে।
টেস্টের প্রতি ক্রিকেটারদের আগ্রহী করে তুলতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড চাইলে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার পথে হাঁটতে পারে। ইংল্যান্ডে একটা সময় ছিল কেবল টেস্টে যারা ভালো করতেন, তারাই কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকতে পারতেন। এমনটা চাইলে করতে পারে বাংলাদেশ। কারণ ভিত্তি দুর্বল রেখে বেশি দূর টিকে থাকার সুযোগ নেই।
আর প্রতিবার হেরে হেরে, ভুল থেকে শেখার প্রতিজ্ঞাও বাদ দিতে হবে। কেন না প্রশ্ন হলো, আর কতকাল ভুল থেকে শিখবে বাংলাদেশ? শিক্ষার শেষ ঘটিয়ে মাঠে-ময়দানে তার প্রমাণ কবে থেকে দিতে পারবে টিম টাইগার তার সুস্পষ্ট উত্তর খুঁজার সময় এসেছে এখনই।
লেখক
সাংবাদিক, সময় টেলিভিশন।

করোনা ভাইরাস লাইভ

বাংলার সময়
বাণিজ্য সময়
বিনোদনের সময়
খেলার সময়
আন্তর্জাতিক সময়
মহানগর সময়
অন্যান্য সময়
তথ্য প্রযুক্তির সময়
রাশিফল
লাইফস্টাইল
ভ্রমণ
প্রবাসে সময়
সাক্ষাৎকার
মুক্তকথা
বাণিজ্য মেলা
রসুই ঘর
বিশ্বকাপ গ্যালারি
বইমেলা
উত্তাল মার্চ
সিটি নির্বাচন
শেয়ার বাজার
জাতীয় বাজেট
বিপিএল
শিক্ষা সময়
ভোটের হাওয়া
স্বাস্থ্য
ধর্ম
চাকরি
পশ্চিমবঙ্গ
ফুটবল বিশ্বকাপ
ভাইরাল
সংবাদ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ সংবাদ
Latest News
এক্সক্লুসিভ লাইভ
বিপিএল ২০২০

করোনা ভাইরাস লাইভ

আপনিও লিখুন
ছবি ভিডিও টিভি আর্কাইভ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
GoTop